দেশের ব্যাংক খাতে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বড় ধরনের ছাড় ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, চিহ্নিত ঋণখেলাপিরা তাদের মূল ঋণ বা আসল অর্থ এককালীন পরিশোধ করে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি পেতে পারেন। এক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে থাকা সব ধরনের আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফ করা হবে। এমনকি ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় পরিশোধের বাধ্যবাধকতাও শিথিল করা হয়েছে।
তবে বিশেষ এই সুবিধা পেতে হলে গ্রাহকদের আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো খেলাপি ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি সব তফসিলি ব্যাংকের জন্য এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সবাই ঢালাওভাবে এই সুবিধা পাবেন না। নির্দিষ্ট কিছু শর্তের ভিত্তিতে কেবল প্রকৃত সংকটে পড়া গ্রাহকরাই এই সুযোগের আওতায় আসবেন-
মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণির খেলাপি: চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে যেসব ঋণখেলাপির নাম ব্যাংকের মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত হয়েছে, কেবল তারাই এই সুবিধার জন্য যোগ্য হবেন। (সাধারণত ঋণের কিস্তি বা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সময় এক বছর বা তার বেশি পার হলে সেটি এই শ্রেণিভুক্ত হয়)।
প্রকৃত আর্থিক সংকটে থাকা ব্যবসায়ী: যেসব ঋণগ্রহীতা বাস্তবসম্মত কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছেন কিন্তু ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রাখেন এবং ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে যাদের অতীত রেকর্ড ও আন্তরিকতা ভালো, তারা এই ছাড় পাবেন।
কৃষক থেকে শিল্পপতি (সবার জন্য সমান সুযোগ): এই সুবিধায় ঋণের পরিমাণের ওপর কোনো বৈষম্য করা হবে না। ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি—সব অঙ্কের ঋণের জন্যই নিয়মটি সমান।
অগ্রাধিকার খাত: কৃষি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের স্বল্পমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে এই সুবিধা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এককালীন আসল পরিশোধ: ঋণগ্রহীতাকে তার অতীতের সকল ঋণ বা আর্থিক দায় (মূল অর্থ) একসাথে পরিশোধ করতে হবে।
পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন: গ্রাহকের সাথে ব্যাংকের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এই সুদ মওকুফের চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।
সময়সীমা: আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অবশ্যই ঋণের অর্থ ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে, বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। বিগত সরকারের আমলে নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ তৈরি হয়েছে, যার একটি বড় অংশই এখন আদায় করা অনিশ্চিত।
নগদ অর্থ সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে সচল করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ নিয়েছে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, এর ফলে খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ আদায় হবে এবং সেই অর্থ নতুন করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ হিসেবে দেওয়া সম্ভব হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করবে।