
গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে যেখানেই যান না কেন, একটা বিষয় যেন আপনার জন্য অবধারিত; সেটা হলো মশার কামড়। আর মশা কামড়ানোর পর সারা শরীর জুড়ে তৈরি হওয়া বড় বড় চুলকানিযুক্ত লাল চাকা আপনাকে হয়তো সপ্তাহের পর সপ্তাহ ভোগায়।
অথচ আপনার পাশেই থাকা বন্ধু বা পরিবারের অন্য কেউ হয়তো একদম শান্তিতে আছেন। মশা তাদের ছোঁয়া তো দূরের কথা, কাছেও ঘেঁষছে না। যাদের মশা একটু-আধটু কামড়ায়, তাদেরও বড়জোর একটা ছোট লাল বিন্দুর মতো দাগ হয় মাত্র।
আমাদের চারপাশে এমন অনেকেই আছেন যারা নিজেদের রসিকতা করে মস্কিটো ম্যাগনেট বলে ডাকেন। বন্ধুরা হয়তো মজা করে বলেন, আপনার রক্ত বুঝি মশার কাছে অতিরিক্ত মিষ্টি। বিজ্ঞান বলছে, বন্ধুদের এই রসিকতা কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়!
আসলে মশা আমাদের শরীরে বসার অনেক আগে থেকেই দূর থেকে আমাদের শরীরের নানা সংকেত বা সিগন্যাল পড়তে পারে। মানুষের শরীর থেকে প্রতিনিয়ত নিঃশ্বাস ও শরীরের গন্ধের মতো অসংখ্য জৈবিক উপাদান বা মার্কার বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
কার শরীর মশার কাছে কতটা আকর্ষণীয় হবে, তা মূলত নির্ধারণ করে এই উপাদানগুলোই। আর কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই আকর্ষণের সিগন্যালগুলো এতটাই তীব্র থাকে যে, মশারা তাদের দিকেই ছুটে যায়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, রক্তচোষা এই পতঙ্গটি মূলত কোন ৩টি উপায়ে আপনার অবস্থান শনাক্ত করে এবং আপনাকে তাদের হিট লিস্টের শীর্ষে রাখে-
কার্বন ডাই-অক্সাইড: দূর থেকে পাওয়া মশার প্রধান নিমন্ত্রণ
শুরুতেই একটা তথ্য পরিষ্কার করা ভালো। সব মশা কিন্তু মানুষকে কামড়ায় না, কেবল স্ত্রী মশারাই কামড়ায়। ডিমের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের খোঁজে তারা মানুষের রক্তের দিকে ছুটে আসে।
প্রায় ১০ মিটার দূর থেকেই মশারা তাদের শিকারকে চেনার জন্য চোখ এবং ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করে। আর এই কাজে তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো আমাদের নিঃশ্বাসের সাথে বের হওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইডের মেঘ।
মানুষ যখন নিঃশ্বাস ছাড়ে, তখন কার্বন ডাই-অক্সাইডের যে ধারা তৈরি হয়, তা মশার ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে তোলে এবং তাদের শিকার খোঁজার আচরণকে উসকে দেয়। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যেহেতু শিশুদের তুলনায় বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে, তাই মশার কাছে তারা বেশি আকর্ষণীয়।
শরীরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা
মশারা কেবল কার্বন ডাই-অক্সাইডই খোঁজে না, তারা শরীরের তাপ এবং আর্দ্রতার প্রতিও ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়। আর কার্বন ডাই-অক্সাইড যখন এই উত্তাপের সাথে মেশে, তখন মশার আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়।
যেমন, একজন গর্ভবতী নারী সাধারণ নারীর তুলনায় মশার কাছে দ্বিগুণ আকর্ষণীয় হতে পারেন। এর কারণ গর্ভাবস্থায় শরীরের বিপাকীয় চাহিদা ও নিঃশ্বাসের পরিমাণ বেড়ে যায়। যার ফলে শরীর বেশি উত্তপ্ত থাকে এবং বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়।
নারীর গর্ভাবস্থা নিয়ে যুক্তরাজ্যের ডারহাম ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথ এন্টারমোলজির অধ্যাপক স্টিভ লিন্ডসে বিষয়টিকে সহজ করে বলেছেন, আপনার ভেতরে তখন যেন একটা ছোট চুল্লি জ্বলছে; আপনি সাধারণের চেয়ে বেশি গরম থাকেন।
একইভাবে যারা নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম করেন, তারা কাজ করার সময় এবং ঠিক পর মুহূর্তটিতে মশার সহজ লক্ষ্যে পরিণত হন। কারণ পরিশ্রমের ফলে শরীর ঘেমে যায়, উত্তপ্ত হয় এবং বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়।
স্বভাবতই, বড় গড়নের মানুষের শরীর থেকে বেশি তাপ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হওয়ায় তারাও মশার নজরে পড়েন বেশি।
ত্বকের নিজস্ব গন্ধ: মশার আসল আকর্ষণ
মশা যখন উড়তে উড়তে আপনার শরীরের ১০ মিটারেরও বেশি কাছাকাছি চলে আসে, তখন তারা চূড়ান্তভাবে শিকার বেছে নেয় ত্বকের গন্ধ দিয়ে।
‘মূলত গন্ধই নির্ধারণ করে মশা কাকে কামড়াবে। আমাদের ত্বক থেকে নির্গত হওয়া ছোট ছোট, অতি উদ্বায়ী রাসায়নিক উপাদানগুলোই এই পার্থক্য গড়ে দেয়। মশারা মূলত এক রাসায়নিকের পৃথিবীতে বাস করে’, বলছিলেন অধ্যাপক লিন্ডসে।
আমাদের ত্বকে থাকা অণুজীব বা মাইক্রোবায়োম চামড়ার ওপর থাকা কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাটি অ্যাসিড এবং পেপটাইডগুলোকে ভেঙে ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড বা উদ্বায়ী জৈব যৌগে রূপান্তর করে।
এগুলো খুব সহজেই বাতাসে মিশে যায় এবং মশা তা আলাদাভাবে চিনতে পারে। মানুষের ত্বকে এমন প্রায় ৫০০টিরও বেশি উপাদান থাকে। ত্বক থেকে স্বাভাবিকভাবে বের হওয়া অ্যামোনিয়া এবং ল্যাকটিক অ্যাসিডের সাথে যখন কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের উপস্থিতি যোগ হয়, তখন মশার জন্য সেই আকর্ষণ প্রতিরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষের ত্বকে কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। মশারা সেই গন্ধযুক্ত মানুষকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। এই আকর্ষণের মাত্রা একজনের চেয়ে অন্যজনের ক্ষেত্রে ১০০ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, আপনার জীবনযাত্রার ধরন যেমনই হোক না কেন, মশার কাছে আপনার এই আকর্ষণ আজীবন একই রকম থাকে।
যমজ সন্তানদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, অভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রে মশার কামড় খাওয়ার হার সমান। কিন্তু ভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রে এই হার আলাদা। এর অর্থ হলো, মশাকে আকর্ষণ করার এই শারীরিক গন্ধটি আমরা বংশগতভাবে বা জিনগতভাবে পেয়ে থাকি।
কামড়ের তীব্রতা ও অনুভূতির তফাত
অনেকের মনে হতে পারে মশা শুধু তাকেই বুঝি বেছে বেছে কামড়ায়। তবে এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বিষয়ও জড়িয়ে আছে। আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জিনগুলোর সাথে মশার কামড়ের প্রতিক্রিয়ার একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। আর এই জিনগুলো অ্যালার্জির সাথেও সম্পর্কিত।
ফলে, মশার কামড়ে কার শরীর কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা মানুষভেদে ভিন্ন হয়। কারো শরীর মশার কামড়ে মারাত্মক চুলকানি ও বড় চাকা হয়ে ফুলে ওঠে। আবার কেউ কেউ কামড় খেলেও ত্বকে সামান্য একটা লাল দাগ ছাড়া আর কিছুই টের পান না। যাদের শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়, স্বাভাবিকভাবেই তারা মনে করেন মশা তাদের বেশি কামড়াচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি