
গভীর ঘুমের ঘোরে হঠাৎ মনে হলো কোনো উঁচু স্থান বা পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছেন, আর তাতেই ধড়ফড়িয়ে ভেঙে গেল ঘুম। এমন অদ্ভুত, চমকপ্রদ ও ভীতিকর অভিজ্ঞতা আমাদের কমবেশি সবারই আছে।
কখনো বা পুরো শরীর কিংবা পা আচমকা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে, বুক ধড়ফড় করে, শ্বাস দ্রুত হয় এবং সাথে সাথে কপালে জমে ওঠে ঘাম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় শরীরের এই আকস্মিক ও অনিচ্ছাকৃত পেশী সংকোচনকে বলা হয় ‘হিপনিক জার্ক’।
দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা আর ক্লান্তির মাঝে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ঘুমের ঘোরে এমনটা হওয়া কি কোনো বড় শারীরিক বা স্নায়বিক সমস্যার লক্ষণ? নাকি এটি একেবারেই স্বাভাবিক?
স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, হিপনিক জার্ক কোনো বিরল বিষয় নয়, বরং অত্যন্ত সাধারণ একটি শারীরিক প্রক্রিয়া।
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তবে ব্যক্তিভেদে এর তীব্রতা ও প্রকাশের ধরন ভিন্ন হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে এই ঝাঁকুনি এতটাই মৃদু বা হালকা হয় যে তারা নিজেরা কিছুই টের পান না, কেবল পাশে ঘুমিয়ে থাকা সঙ্গী বা পরিবারের মানুষটি তা খেয়াল করতে পারেন।
আবার অনেকের ক্ষেত্রে এর তীব্রতা এত বেশি থাকে যে, তারা রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসেন।
চিকিৎসকেরা জানান, আমাদের ঘুম মূলত কয়েকটি ধাপে বিভক্ত। মানুষ যখন পুরোপুরি জেগে থাকা অবস্থা থেকে এন-১ বা এন-২ নামক হালকা ঘুমের স্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে। অর্থাৎ যখন পেশীগুলো শিথিল হতে থাকে। তখনই এই হিপনিক জার্ক বা শূন্যে পড়ে যাওয়ার অনুভূতিটি বেশি ঘটে।
বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এটি কোনো বড় রোগ বা বিপদের সংকেত না হলেও, কিছু কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস এবং শারীরিক পরিস্থিতি হিপনিক জার্কের প্রবণতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো চরম শারীরিক ক্লান্তি, অনিদ্রা এবং শোয়ার ভঙ্গির অসুবিধা।
এছাড়া বর্তমান যুগের প্রতিযোগিতামূলক জীবনে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ আমাদের শরীরকে সহজে রিল্যাক্স বা শান্ত হতে দেয় না। মস্তিষ্ক যখন সারাক্ষণ এক ধরনের সতর্ক অবস্থায় থাকে, তখন ঘুমের মধ্যেও তা সহজে চমকে ওঠে।
চিকিৎসকেরা আরও জানান, অতিরিক্ত চা-কফি বা ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় গ্রহণ এবং নিকোটিন বা ধূমপানের অভ্যাস পেশীর এই স্বতঃস্ফূর্ত স্পন্দনকে ট্রিগার করে। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত ঘুমের চক্র ও মানসিক অবসাদ আমাদের মস্তিষ্ককে গভীর ঘুমে যাওয়ার স্বাভাবিক রূপান্তরকে কঠিন করে তোলে, যার ফলে এই সমস্যাটি বারবার ফিরে আসে।
হিপনিক জার্ক সাধারণত কোনো গুরুতর রোগ নয় এবং এর জন্য কোনো ওষুধেরও প্রয়োজন হয় না। তবে একে সবসময় অবহেলা করাও ঠিক হবে না।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি এই পেশীর ঝাঁকুনি প্রতি রাতে, টানা বা ঘন ঘন হতে থাকে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে যদি খিঁচুনির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তীব্র নাক ডাকার সমস্যা থাকে, মুখ থেকে লালা বা ফেনা বের হয় কিংবা ঘুমের ঘোরে পেশী অতিরিক্ত শক্ত হয়ে যায়, তবে বিষয়টি নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
এমনকি ঘুমের মধ্যে অজান্তেই প্রস্রাব হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে অবিলম্বে সচেতন হতে হবে। কারণ, এগুলো অনেক সময় মৃগীরোগ (এপিলেপ্সি) কিংবা ডিমেনশিয়ার মতো দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল স্নায়বিক সমস্যার প্রাথমিক সংকেত হতে পারে।
স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিন্ধুজার সঙ্গে বিশদে বলেছেন, এটা যে শুধু আপনারই হচ্ছে তা নয়। দশজনের মধ্যে সাতজনই কোনো না কোনো সময় এমনটা অনুভব করেছেন। তবে এটা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কেউ কেউ অনুভব করতে পারেন, কেউ আবার সেভাবে অনুভব করেন না।
সূত্র : বিবিসি