
ঘাম ঝরানো গরমের রেশ কাটতে না কাটতেই যখন নতুন করে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস আসে, তখন অনেক নারীর মনেই ভর করে এক ধরনের আতঙ্ক। ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ, মাথা ঘোরানো, পেট ফাঁপা বা শরীর একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়া—তীব্র গরমে নারীদের কাছ থেকে এই শব্দগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে।
তীব্র গরম যে কারো জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহ মূলত নারীদের হৃদযন্ত্র ও রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়ার ওপর একটি বড় ধরনের স্ট্রেস-টেস্ট চাপিয়ে দেয়। ফলে পুরুষদের তুলনায় নারীরা গরমে অনেক বেশি কাবু হয়ে পড়েন।
গ্লোবাল হেলথ গবেষকদের মতে, তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিতেও নারীরা কিছুটা এগিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন তীব্র ও ঘন ঘন তাপপ্রবাহ বিশ্বজুড়ে আছড়ে পড়ছে।
নারীদের এই অসম লড়াইয়ের পেছনে যেমন রয়েছে শরীরের ভেতরের হরমোন ও জীববিজ্ঞানের খেলা, তেমনি জড়িয়ে আছে সামাজিক বাস্তবতার নানা গল্প।
হরমোনের খেলা ও শরীরের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া
জীববৈজ্ঞানিক কারণেই নারীদের এই বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রথমত, নারীদের শরীরের হরমোনের নিয়মিত ওঠানামা এবং দ্বিতীয়ত, গরমের প্রতি তাদের শরীরের নিজস্ব সাড়া দেওয়ার পদ্ধতি—যা পুরুষদের চেয়ে একেবারেই আলাদা।
গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের শরীর পুরুষদের তুলনায় কম ঘাম তৈরি করে এবং ঘাম নিঃসরণ শুরু হতেও বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। শরীর থেকে দ্রুত বাড়তি তাপ বের করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা।
আর যেহেতু ত্বক বা কাপড়ে ঘাম সহজে দেখা যায় না, তাই নারীরা নিজেরাও সহজে বুঝতে পারেন না যে তাদের শরীর কতটা ক্লান্ত বা চাপের মুখে রয়েছে। নারীদের শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা এবং চর্বির শতকরা হার পুরুষদের চেয়ে বেশি থাকে। যা শরীরের ভেতরে এক ধরনের বাড়তি ইনসুলেশন হিসেবে কাজ করে।
এর সাথে যোগ হয় নারীদের হরমোনের স্বাভাবিক পরিবর্তন। মাসিক চক্র, পেরিমেনোপজ, মেনোপজ, গর্ভাবস্থা এবং স্তন্যদানের সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে।
এটি আমাদের মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ওলোটপালোট করে দেয়, যা গরমের দিনে হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি ধকল তৈরি করে।
সামাজিক ও বয়সের ঝুঁকি
নারীদের এই সংকটের পেছনে কেবল জীববিজ্ঞানই দায়ী নয়, তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাও বড় ভূমিকা রাখে। কম আয় এবং পরিবার ও প্রিয়জনদের যত্ন নেওয়ার মূল দায়িত্ব সাধারণত নারীদের ওপরেই থাকে। ফলে তীব্র গরমে নিজের যত্ন নেওয়ার সুযোগ তারা অনেক সময় পান না।
বয়সও এখানে একটি বড় নিয়ামক। বয়স যত বাড়ে, গরমের প্রতি মানুষের সহনশীলতা তত কমে। গড়ে নারীরা পুরুষদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন বলে প্রবীণ বয়সে গরমজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নারীরাই বেশি পড়েন। তা ছাড়া বয়স্ক নারীদের ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের মতো সমস্যা বেশি হওয়ায় তারা অনেক সময় তৃষ্ণার কথা বুঝতে পারেন না।
মাসিক চক্রে বাড়ে অস্বস্তি
মাসিক বা পিরিয়ডের সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে নারীদের গরম লাগার অনুভূতি তীব্র হয়। মাসিকের ঠিক আগে প্রোজেস্টেরন হরমোন বেড়ে যাওয়ার কারণে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা এমনিতেই কিছুটা বেড়ে যায়।
এরপর যখন মাসিক শুরু হয়, তখন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। ফলে শরীর ঠান্ডা করতে হৃদযন্ত্রের ওপর দ্বিগুণ চাপ পড়ে।
গরমের দিনে পিরিয়ড চললে নারীদের মধ্যে তীব্র ক্লান্তি, মাথা ঘোরানো, দুশ্চিন্তা এবং অনিদ্রার সমস্যা প্রকট হয়। অনেকে শরীর এত দুর্বল ও অবসন্ন অনুভব করেন যে স্বাভাবিক কাজকর্ম করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। রক্তপাতের কারণে শরীর থেকে আয়রন কমে যাওয়ায় অক্সিজেনের প্রবাহ ব্যাহত হয়, যা হৃদযন্ত্রকে আরও বেশি খাটায়।
মেনোপজের নারীদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা
পেরিমেনোপজ ও মেনোপজ পর্যায়ে থাকা নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ার কারণে হট ফ্লাশ এবং রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া খুব সাধারণ বিষয়। হরমোন-সংবেদনশীল ক্যানসার কিংবা এন্ডোমেট্রিওসিস ও পিএমওএসের মতো জরায়ুজনিত জটিলতার কারণে যাদের কৃত্রিম উপায়ে মেনোপজ করানো হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে।
দাবদাহের সময় এই হট ফ্লাশ ও রাতের ঘাম এতটাই ভয়াবহ রূপ নেয় যে নারীদের ঘুমোনো দায় হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি এই কষ্টকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। হরমনাল থেরাপিও অনেক সময় এই তীব্র কষ্ট পুরোপুরি উপশম করতে পারে না।
গর্ভাবস্থায় বাড়তি ধকল
গর্ভবতী নারীদের শরীর সাধারণের চেয়ে বেশি বিপাকীয় তাপ উৎপন্ন করে এবং তাদের তরলের চাহিদাও থাকে অনেক বেশি। ফলে তীব্র গরমে তারা খুব সহজেই হিট স্ট্রেস বা তাপজনিত ক্লান্তির শিকার হন। গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে প্রোজেস্টেরনের ওঠানামা শরীরকে উত্তপ্ত করে তোলে, যা শেষের দিকে ইস্ট্রোজেনের সাথে মিলে আবার স্বাভাবিক হয়।
এর সাথে যোগ হয় শারীরিক অবয়বের পরিবর্তন। পেটে একটি নতুন প্রাণ বহন করার কারণে হৃদযন্ত্রের ওপর এমনিতেই বাড়তি চাপ থাকে।
গবেষণা বলছে, তীব্র গরম গর্ভবতী মা ও সন্তান উভয়ের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের গর্ভাবস্থায় আগে থেকেই নানা জটিলতা রয়েছে। গরমের তীব্রতা থেকে বাঁচতে অনেক হবু মাকে ঘরের মেঝেতে ঘুমানো কিংবা ঠান্ডা পানিতে গোসল করার মতো কঠিন পথও বেছে নিতে হয়।
তীব্র গরমের কারণে মানুষের রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে। ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল ও লবণ বেরিয়ে যাওয়ার কারণে তৈরি হয় হিট এক্সহসশন বা তাপজনিত ক্লান্তি। রক্তচাপ খুব বেশি কমে গেলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, এই তীব্র গরমকে শরীরের একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখতে হবে। শরীরকে সুস্থ রাখতে জীবনযাত্রার গতি কিছুটা কমিয়ে আনতে হবে। প্রচুর তরল খাবার খাওয়া, ফ্যান বা শীতলকারক যন্ত্র ব্যবহার করা, সূর্যোদয়ের আগে বা সূর্যাস্তের পর ব্যায়াম করা এবং মাসিকের হিসাব রাখার পাশাপাশি হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে।