
হঠাৎ আর্থিক হিসাব এলোমেলো হয়ে যাওয়া, সময়মতো বিল পরিশোধ না করা, সেবা বন্ধের শেষ সতর্কবার্তা আসা, দিনে একাধিকবার ব্যাংক থেকে টাকা তোলা এমনকি প্রয়োজনের তুলনায় অস্বাভাবিক কেনাকাটা করা—এসব আচরণ কখনো কখনো ডিমেনশিয়ার আগাম সংকেত হতে পারে।
সারাজীবন অর্থের বিষয়ে দায়িত্বশীল থাকা কোনো মানুষ যদি হঠাৎ নিজের আর্থিক বিষয়ে অসতর্ক হয়ে পড়েন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। কারণ, ডিমেনশিয়া শনাক্ত হওয়ার আগেই এমন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের গবেষকেরা দেশটির ক্রেডিট রিপোর্ট ও মেডিকেয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে এমনই ইঙ্গিত পেয়েছেন।
তাদের গবেষণা বলছে, ডিমেনশিয়া শনাক্ত হওয়ার আগের পাঁচ বছরে একজন মানুষের গড় ক্রেডিট স্কোর দুর্বল হতে শুরু করতে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে বিল বা ঋণের কিস্তি পরিশোধে অনিয়ম।
গবেষকেরা বলছেন, স্মৃতিজনিত রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই এর ক্ষতিকর আর্থিক প্রভাব একটি পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ের আলঝেইমার ও এ ধরনের অন্যান্য রোগ নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণের পরিমাণ বাড়ানো, ক্রেডিট ব্যবহারের ধরন এবং বিভিন্ন ধরনের ঋণের ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২০ সালে জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের করা একটি গবেষণাতেও একই ধরনের ফল পাওয়া গিয়েছিল।
ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ব্লুমিংটনের বাসিন্দা মার্সি টিডওয়েলের নিজের অভিজ্ঞতাও গবেষণার এসব ফলের সঙ্গে মিলে যায়। ২০২০ সালে তার মায়ের এক ধরনের ডিমেনশিয়া ধরা পড়ে। এরপর থেকে তিনি মেয়ের সঙ্গেই বসবাস করছেন।
টিডওয়েল জানান, তার মা সারা জীবন অর্থের বিষয়ে অত্যন্ত গোছানো ছিলেন। স্বামী সামরিক বাহিনীতে চাকরি করায় জীবনে বহুবার তাদের স্থান বদলাতে হয়েছে। প্রতিবারই তিনি পরিবারের বিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র খুব যত্নে সামলে রেখেছেন।
তবে চলতি বছর মায়ের পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে টিডওয়েলের মনে হয়েছে, প্রায় ২০১৫ সাল থেকেই তার মায়ের স্মৃতিশক্তিতে সমস্যা শুরু হয়েছিল। কারণ, ওই সময়ের পর থেকেই তার হিসাব রাখার অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা যায়।
আগে তিনি চেকবুকে লেখা চেক, জমা ও টাকা তোলার হিসাব নিখুঁতভাবে লিখে রাখতেন। পরে সেই হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। কোথাও লেখা কেটে দেওয়া, আবার একই হিসাব বারবার যোগ করা—সবই দেখা যেত।
টিডওয়েলের ভাষায়, তার মা বুঝতে পারছিলেন হিসাব ঠিকঠাক হচ্ছে না। পরে তিনি দেখেন, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সঞ্চয়ের টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি বাজার-সদাইয়ের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি টাকা তোলা হয়েছিল।
তবে ডিমেনশিয়ার কারণে কেউ আর্থিকভাবে অসহায় হয়ে পড়ার আগেই কিছু পরিকল্পনা করে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রোগটি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের আর্থিক ভুল বা প্রতারণার ঝুঁকি সবসময় বুঝতে নাও পারেন।
মার্সি টিডওয়েল এ ক্ষেত্রে নিজের পরিবারের আগাম প্রস্তুতির কথা বলেছেন। ২০০৮ সালে তার বাবা মারা যাওয়ার এক বছর পর এবং মায়ের ডিমেনশিয়া শনাক্ত হওয়ার প্রায় ১২ বছর আগে তিনি ও তার ভাইবোনেরা মাকে একজন আইনজীবীর কাছে নিয়ে যান।
সেখানে মায়ের উইল করা হয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একজন প্রতিনিধি নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে মায়ের আর্থিক বিষয় দেখাশোনার জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নিও নির্ধারণ করা হয়।
এই আগাম প্রস্তুতিই পরে টিডওয়েলের জন্য অনেক কিছু সহজ করে দেয়। ২০১৮ সালে তিনি মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অনলাইন প্রবেশাধিকার পান। এতে নিয়মিত দেখে নিতে পারতেন, কোনো অস্বাভাবিকতা হচ্ছে কি না। ২০২০ সালের মধ্যে মায়ের বিল পরিশোধও অনলাইনে স্বয়ংক্রিয় করে দেন।
টিডওয়েলের মতে, প্রয়োজন হওয়ার আগেই পরিকল্পনা করে রাখা উচিত। কারণ, পরে যখন সত্যিই সেই প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন আগের সেই প্রস্তুতিই অনেক বড় সহায়তা হয়ে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিংও ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে আগাম আর্থিক পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেয়। সংস্থাটি পরিবারের সদস্যদের শুরুতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে। এর মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করাও রয়েছে।
তবে যত আগেই পরিকল্পনা করা হোক, প্রিয় একজন মানুষকে ডিমেনশিয়ার কারণে ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখা সহজ নয়। টিডওয়েলও সেই বাস্তবতার কথা বলেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, যতটা সম্ভব প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবু পরিস্থিতি কঠিন। তার পরামর্শ খুব সহজ ‘যে বিষয়গুলো আগে থেকেই সহজ করে রাখা সম্ভব, সেগুলো আগেই সহজ করে রাখা উচিত।’
সূত্র : সিএনএন।