দেশে গত দেড় দশকে ১৮টি বন্যপ্রাণী বিলুপ্তি হয়েছে। এর আগের দশকে বিলুপ্তি হয়েছে ১৩টি। অর্থাৎ দেশে গত ২৫ বছরে ৩১টি বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিলুপ্তি হয়েছে। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এক জরিপে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে এ জরিপ।
জরিপে দেখা দেখা গেছে, বিলুপ্ত এসব প্রাণীর মধ্যে ১৯ প্রজাতির পাখি, ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও এক প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে।
আর বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে আরও ৯০ প্রজাতির প্রাণী। এ ছাড়া দেশের ৩৯০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী কোনো না কোনোভাবে বিপন্ন। এর মধ্যে ৫৬ প্রজাতি মহাবিপন্ন, ১৮১ প্রজাতি বিপন্ন এবং ১৫৩ প্রজাতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এর মধ্যে আজ রবিবার সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব প্রাণী দিবস’। প্রতিবছর ৪ অক্টোবর এ দিবস পালিত হয়। প্রাণীদের কল্যাণ ও অধিকার রক্ষা এবং প্রাণীর প্রতি মানুষের সহানুভূতি বৃদ্ধি করা এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। এবারের প্রতিপাদ্য ‘তাদের চোখে বিশ্ব দেখুন’।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক বন্যপ্রাণী ও প্রাণী গবেষক অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, ‘বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে মানবসৃষ্ট কারণ সবচেয়ে বেশি। প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, নষ্ট ও খাবার সংকটে পড়ছে বন্যপ্রাণীরা।
দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বন, জলাশয় এবং আশপাশের ঝোপঝাড়ের মতো প্রাকৃতিক সম্পদে মানুষের হস্তক্ষেপ বাড়ছে। ফলে বন্যপ্রাণীরা হারাচ্ছে নিজেদের বাসস্থান।
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের পৃথিবীতে টিকে থাকা এবং ভালো থাকার সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্বের গভীর সংযোগ রয়েছে। না হয় মানুষের অস্তিত্বও সংকটে পড়বে। বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এখন কেবল দরকারই নয়, বরং অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।’
আইইউসিএনের তালিকা অনুযায়ী, একসময় বাংলাদেশে ৫৬৬ প্রজাতির পাখি ছিল। এর মধ্যে ১৯ প্রজাতির পাখি দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও এক প্রজাতির সরীসৃপ বিলুপ্ত হয়েছে। আইইউসিএনের ২০০০ সালের জরিপে বিলুপ্ত বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ছিল ১৩টি। ১৫ বছর পর ২০১৫ সালের জরিপে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১টিতে।
বিলুপ্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকায় রয়েছে ডোরাকাটা হায়েনা, ধূসর নেকড়ে, নীলগাই, বান্টিং বা বনগরু, বনমহিষ, সুমাত্রা গণ্ডার, জাভা গণ্ডার, ভারতীয় গণ্ডার, বাদা বা জলার হরিণ, কৃষ্ণ ষাঁড় ও মন্থর ভালুক। বিলুপ্ত পাখির তালিকায় রয়েছে লালমুখ দাগিডানা, সারস, ধূসর মেটে তিতির, বাদা তিতির, বাদি হাঁস, গোলাপি হাঁস, বড় হাড়গিলা বা মদনটাক, ধলাপেট বগ, সাদাফোঁটা গগন রেড, রাজশকুন, দাগি বুক টিয়াঠুঁটি, লালমাথা টিয়াঠুঁটি, গাছ আঁচড়া ও সবুজ ময়ূর। আর সরীসৃপের মধ্যে মিঠাপানির কুমির বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেছে।
জরিপে দেশের ৪৫টি নদীর মোট চার হাজার ৮৯৩ কিলোমিটার এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ এলাকায় ১০৮টি শুশুক ও ডলফিন মারা গেছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে ছয়টি বিশালাকার তিমি এবং ৬০টি বিভিন্ন প্রজাতির ডলফিন মৃত উদ্ধার করা হয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, মৃত্যুর জন্য সামুদ্রিক প্রাণীর ৬৫ শতাংশই ভূতুড়ে জাল ও ফাঁস জালই দায়ী। এসব জালে আটকে গেলে প্রাণীগুলো পানির ওপরে আসতে পারে না। এ সময় অক্সিজেনের অভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে শ্বাসরোধে মারা পড়ে। এ ছাড়া ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৭৬টি সামুদ্রিক প্রাণী মৃত উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে নদী ও উপকূলীয় অববাহিকায় এখনো দুই হাজার ৩০৭টি গাঙ্গেয় ডলফিন টিকে আছে।
হাতি, বাঘসহ বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ও সারা দেশে বন্যপ্রাণী নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে ওয়াইল্ডলাইফ কমিশন গঠন করেছে সরকার। চলতি বছরের জুলাইয়ে ১০ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, দুবাই সাফারি পার্কের সাবেক প্রিন্সিপাল বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আলী রেজা খান, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আশরাফুল হক নোবেল ও প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান ও বন অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি অফিসার হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকার নাইন।























