ভারতীয় সিনেমার ক্ষুব্ধ চোখ আর বজ্রকণ্ঠের অভিনেতা নানা পাটেকার মারা গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) গোয়ার দোনা পাওলার বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। ভোরে তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়।
পরে তাকে নেওয়া হয় মণিপাল হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে টানা সিপিআর দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ছেলে মলহার পাটেকার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় ৪৫ মিনিট তাকে জীবিত রাখার চেষ্টা করেছিলেন ডাক্তারা।
নানা পাটেকারের জীবনের সবচেয়ে অন্যরকম অধ্যায় সম্ভবত সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক। ১৯৯১ সালে তিনি পরিচালনা করেন প্রহার চলচ্চিত্র। ছবিটিতে সেনা কমান্ডোর চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে তিনি সেনা প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রস্তুতিই তাকে সেনাবাহিনীর খুব কাছে নিয়ে যায়।
অভিনয়ের জন্য শেখা শৃঙ্খলা তার কাছে পেশার চেয়ে বেশি কিছু হয়ে ওঠে। তার সেনাসংযোগ ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনারারি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে ছিলেন।
১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় সক্রিয় ছিলেন। ক্যামেরার সামনে সৈনিক সাজা একজন অভিনেতা এভাবেই বাস্তব জীবনের সৈনিক হয়ে ওঠেন।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের কোঙ্কণ উপকূলের মুরুদ-জাঞ্জিরায় বিশ্বনাথ পাটেকারের জন্ম। সিনেমার দুনিয়ায় তিনি পরিচিত হন ‘নানা’ নামে। শৈশব-কৈশোর কেটেছে মুম্বাইয়ে, সচ্ছলতার মধ্যে নয়, সংগ্রামের ভেতরে।
পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনে ছোট বয়সেই তাকে কাজে নামতে হয়েছিল বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে। তিনি মুম্বাইয়ের সার জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড আর্ট থেকে পড়াশোনা করেন। ছবি আঁকার হাতটি পরে তার অভিনয়েও ছাপ ফেলেছে। প্রতিটি চরিত্র তিনি যেন তুলির টানে গড়তেন।
শুরুটা মঞ্চ দিয়ে। মারাঠি থিয়েটারে নিজের জায়গা তৈরি করার পর ১৯৭৮ সালে গামন ছবি দিয়ে তিনি বড়পর্দায় আসেন। সেই বছরই নীলকান্তিকে বিয়ে করেন। প্রথম দিকের কাজ ছিল ছোট, কিন্তু কণ্ঠস্বর আর চোখের তীব্রতা দর্শকের নজর কেড়েছিল।
আশির দশকের শেষে পরিন্দা ছবির চরিত্র তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। সেই কাজের জন্য তিনি সেরা সহ-অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার দুটিই পান। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি তিনি হয়ে ওঠেন চাহিদাসম্পন্ন তারকা-অভিনেতা। ভিলেন ও নায়কের মাঝের ধূসর জায়গাই ছিল তার রাজত্ব।
নানা শুধু ক্ষুব্ধ মানুষের চরিত্রে আটকে থাকেননি। ওয়েলকাম (২০০৭) ও এর সিক্যুয়েল ওয়েলকাম ব্যাকে তিনি হৃদয়বান গ্যাংস্টার উদয় শেট্টির চরিত্রে প্রশংসিত হন। রাজনীতি (২০১০) ছবিতে রাজনীতিকের ভূমিকাও দর্শক মনে রেখেছে।
অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক হিসেবে প্রায় পাঁচ দশক তিনি হিন্দি ও মারাঠি সিনেমা এবং থিয়েটারে কাজ করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি পদ্মশ্রী সম্মাননা পান।
সিনেমার আলো থেকে দূরে সহজ জীবনযাপনই ছিল তার পছন্দ। সাদামাটা কথা বলা আর বাস্তবের সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখার প্রবণতা তার ব্যক্তিজীবনেও প্রতিফলিত হতো। পুরোনো সহকর্মীরা তার বাড়িতে আসতেন, আর তার রান্নার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ত সামাজিক মাধ্যমে। সামাজিক কাজেও তার পরিচিতি ছিল। নাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
নানা পাটেকারের মৃত্যুতে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমেছে। যে মানুষটি পর্দায় সৈনিকের পোশাকে ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য, বাস্তবেও তিনি সেই পোশাকের মর্যাদা বহন করেছেন।
প্রহারের পরিচালক থেকে সীমান্তের সৈনিক পর্যন্ত এই যাত্রাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখবে। তার সংলাপ, চোখের দৃষ্টি আর কণ্ঠের ঝাঁজ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে থেকে যাবে।


.jpg)


















