বিভাগীয় শহর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত দামের কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। কিন্তু ঢাকার চিত্র ভিন্ন। রাজধানীতে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা।
অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। বাড়তি দামের দায় নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা দোষ দিচ্ছেন ডিলারদের। ডিলারদের অভিযোগ, বাড়তি টাকা নিচ্ছে বিপণন কোম্পানিগুলো। এই টানাপোড়েনের মধ্যে বেশি দাম দিয়েই গ্যাস কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। গত সেপ্টেম্বরে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
এক মাসের ব্যবধানে এতটা দাম বাড়ায় গ্রাহকদের মধ্যে এমনিতেই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি দাম। রাজধানীর কোনো কোনো দোকানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি।
এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ইতিমধ্যে সরকার নির্ধারিত দামের বেশি বিক্রি না করতে ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দিয়েছে।
ঢাকার বাইরের ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন, তারা কোম্পানির কাছ থেকে বিইআরসি নির্ধারিত দামেই এলপিজি কিনছেন। তাদের দাবি, এখন কোম্পানিগুলো তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিচ্ছে না।
তবে ঢাকার ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলোই বাড়তি দাম নিচ্ছে। এ নিয়ে তারা বিইআরসিতেও অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
তবে জমা দেওয়া কাগজপত্রে দেখা গেছে, বেশির ভাগ কোম্পানি বিইআরসি নির্ধারিত দামেই এলপিজির ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) নিচ্ছে। মাত্র দু-একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে সারা দেশের এলপিজি ব্যবসায়ীদের নিয়ে ‘এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি সংগঠন গড়ে উঠেছে। সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছেন গাজীপুরের ব্যবসায়ী সেলিমখাত।
তিনি জানিয়েছেন, আগামী ১২ তারিখ জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে আরও ১০০ টাকা বেশি দাম নির্ধারণের দাবি জানাবেন।
ঢাকার ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রি করছেন, অথচ দেশের অন্য এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে সেলিমখাতের বক্তব্য, ‘কোম্পানিগুলোই তো ডিও নিচ্ছে দুই হাজার টাকার ওপরে। তাদের বলেন না কেন?’
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক সাব্বিরের দাবি, কোম্পানিগুলো ব্যাংকে বেশি টাকা জমা নিচ্ছে। কিন্তু রসিদ দিচ্ছে বিইআরসি নির্ধারিত দামের। তবে এ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ চেয়েও গত তিন দিনে তা পাওয়া যায়নি।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান পাওয়া গেছে। গতকাল হাতিরপুলের তাকওয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেন জানিয়েছেন, রাতে তার কাছে গ্যাস আসবে। প্রতি সিলিন্ডার বিক্রি করবেন ২ হাজার ৩০০ টাকায়।
একই সময়ে বনশ্রী সি ব্লকের ফরাজি এন্টারপ্রাইজের জাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, ১২ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যাবে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় পূর্ব রামপুরার একটি দোকানে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। দোকানির ভাষ্য, তিনি প্রতিটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৪২০ টাকায়। এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
রামপুরার বাসিন্দা দিলরুবা সুলতানাও জানিয়েছেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৬০০ টাকায়।
ঢাকার বাইরে এলপিজির দাম কেমন, তা জানতে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী এবং নড়াইলের কালিয়া উপজেলার কয়েকজন বিক্রেতা ও ক্রেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় এলপিজি বিক্রি হচ্ছে ঢাকার তুলনায় কম দামে।
খুলনার শামসুর রহমান রোডের আনাম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার দোকান থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনলে দাম পড়বে বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। তবে বাসায় পৌঁছে দিতে হলে দিতে হবে ১ হাজার ৯০০ টাকা। তার দাবি, কোম্পানির কাছ থেকে তিনি নির্ধারিত দামেই এলপিজি কিনেছেন। বাড়তি টাকা দিতে হয়নি।
খুলনার ক্রেতা টিপু সুলতান জানিয়েছেন, তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ১ হাজার ৯০০ টাকায়।
বরিশালের খান গ্যাসের স্বত্বাধিকারী মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, তাঁর দোকানে ওমেরা গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। আই গ্যাসের দাম ১ হাজার ৮৭০ টাকা। বাসায় পৌঁছে দিতে হলে প্রতি সিলিন্ডারে আরও ৫০ টাকা দিতে হবে। তিনি আই গ্যাস কিনেছেন ১ হাজার ৮২০ টাকায় এবং ওমেরা গ্যাস ১ হাজার ৮৫০ টাকায়।
তবে বরিশালের ক্রেতা শরিফুল ইসলাম মিলু জানিয়েছেন, তিনি প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি কিনেছেন ২ হাজার টাকায়।
সম্প্রতি দাম বাড়ানোর আগেও ঢাকায় প্রতি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
বিভাগীয় শহরের বাইরের পরিস্থিতি জানতে নড়াইলের কালিয়া উপজেলাতেও খোঁজ নেওয়া হয়েছে। সেখানে কাজী এন্টারপ্রাইজে ১২ কেজির বিএম গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯২০ টাকায়। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কাজী মুকুল জানিয়েছেন, আপাতত তাঁর কাছে বিএম গ্যাস ছাড়া অন্য কোম্পানির সিলিন্ডার নেই।
কালিয়ার ক্রেতা জোবায়ের হোসেন জানিয়েছেন, তিনি এক দিন আগে একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন ১ হাজার ৯০০ টাকায়।
ঢাকায় সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করবেন। আমদানিকারকদের সঙ্গেও কথা বলবেন। তিনি বলেছেন, সমস্যাটির সমাধানের চেষ্টা করা হবে।























