ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

সম্পর্ক বাঁচাতে আসলে যা যা কাজে আসে

The Daily Moon
The Daily Moon
ফেসবুকে শেয়ার
সম্পর্ক বাঁচাতে আসলে যা যা কাজে আসে
একটি ভেঙে পড়তে থাকা সম্পর্ক কি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে?
একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পথে থাকলে শুধু মনই ভাঙে না, শরীরও এর প্রভাব টের পায়। তীব্র ঝগড়া ঘুম নষ্ট করতে পারে। তৈরি হতে পারে শারীরিক ব্যথাও। পরিবারের অন্য সদস্য, এমনকি সন্তানরাও এর প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকে না।

অন্যদিকে, সুখী সম্পর্ক স্বাস্থ্যের জন্যও ইতিবাচক হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো সম্পর্ক শারীরিক সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর সঙ্গে যুক্ত। বিপরীতে, দীর্ঘদিনের অসুখী ও নিম্নমানের সম্পর্ক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাহলে একটি ভেঙে পড়তে থাকা সম্পর্ক কি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে? সম্পর্ক নিয়ে হওয়া গবেষণা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই তা সম্ভব। তবে শুধু ঝগড়া বন্ধ করলেই হবে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, মতবিরোধের সময় দুজন দুজনের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করছেন।

নতুন কোনো সম্পর্কে প্রথম বড় ঝগড়াটি যদি বাসনপত্র পরিষ্কার করা নিয়ে হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও এমন বিষয় নিয়ে মতবিরোধ চলতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সম্পর্কে শুরুতে যে বিষয়গুলো নিয়ে ঝামেলা তৈরি হয়, পরবর্তী বছরগুলোতেও অনেক সময় সেই একই বিষয় ফিরে আসে। সম্পর্কবিষয়ক গবেষণায় এসবকে ‘পারপেচুয়াল’ বা ‘গ্রিডলকড’ সমস্যা বলা হয়।

অর্থাৎ, এমন কিছু সমস্যা থাকে, যেগুলো নিয়ে বারবার আলোচনা বা ঝগড়া হলেও সহজে স্থায়ী সমাধান হয় না।

যেমন টাকা-পয়সা, সন্তানকে কীভাবে বড় করা হবে, যৌনজীবন, সংসারে কার সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্ব পাবে কিংবা ঘরের কাজ ও পরিচ্ছন্নতা কীভাবে ভাগ করা হবে—এসব বিষয় নিয়ে দম্পতিদের মধ্যে বারবার মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যান ও তার সহকর্মীদের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে দম্পতিরা যে ধরনের বিষয় নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছিলেন, চার বছর পরও ৬৯ শতাংশ ক্ষেত্রে একই ধরনের বিষয় নিয়ে তাদের মতবিরোধ ছিল।

অর্থ নিয়ে বিরোধ বিশেষভাবে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হতে পারে। ঘরের কাজ অসমভাবে ভাগ করাও সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বিচ্ছেদের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

তবে মতবিরোধ থাকলেই যে সম্পর্ক খারাপ, তা নয়। সুখী ও অসুখী—দুই ধরনের দম্পতির মধ্যেই ঝগড়া হয়। পার্থক্যটা তৈরি হয় আচরণে।

কাপল থেরাপিস্ট ক্যারি কোলের ভাষ্য, চার ধরনের আচরণ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। এগুলো হলো সমালোচনা, অবজ্ঞা, আত্মপক্ষ সমর্থনে অতিরিক্ত মনোযোগ এবং স্টোনওয়ালিং বা বিরোধের সময় নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়া।

তবে কোল মনে করেন, এসব আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব। দুজনেরই যদি সম্পর্কটি ঠিক করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সঙ্গীর কাছ থেকে বারবার সমালোচনা পাওয়া শুধু সম্পর্কের ওপরই চাপ তৈরি করে না। এটি আগাম মৃত্যুর ঝুঁকির সঙ্গেও উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে, সম্মান, কৌতূহল, সহমর্মিতা এবং একসঙ্গে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো রেসপনসিভনেস। অর্থাৎ সঙ্গী আপনাকে শুনছেন, বুঝছেন এবং প্রয়োজনে পাশে আছেন—এমন অনুভূতি। এই অনুভূতি দাম্পত্য সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনকি শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে।

সম্পর্ক যখন দীর্ঘদিন ধরে তিক্ততায় ভরা থাকে, তখন সহমর্মিতা হারিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।

কাপল থেরাপিস্ট ও মনোবিজ্ঞানী জে লেবোর মতে, থেরাপিতে আসা অনেক দম্পতির মধ্যেই সহমর্মিতা অনেকটাই ক্ষয়ে যায়। তাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, দুজনের মধ্যে সেই সহমর্মিতা আবার কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়?

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কথা বলা ও মন দিয়ে শোনা। লেবোর উল্লেখ করেছেন, সম্পর্কের সংকটের সময় অন্যের কথা মন দিয়ে শোনাটাও কঠিন হয়ে যায়। থেরাপির মাধ্যমে দম্পতিরা আবার সেই দক্ষতা তৈরি করতে পারেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, ‘আমার সঙ্গীর কী সমস্যা?’ এই প্রশ্নের বদলে ‘আমাদের মধ্যে আসলে কী ঘটছে?’ এভাবে বিষয়টিকে দেখা।

কোলের কাছে দুটি বিষয় বিশেষভাবে আশাব্যঞ্জক। প্রথমটি হলো, একজন সঙ্গী যখন অন্যজনকে বলতে পারেন, ‘তুমি কেন এমন অনুভব করছ, সেটা আমি বুঝতে পারছি।’

এর অর্থ, নিজের মতের সঙ্গে না মিললেও অন্যজনের দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করার সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়টি হলো কৌতূহল। সঙ্গীর কথা শুনে যদি কেউ বলেন, ‘তুমি কেন এমন ভাবতে শুরু করলে? আমাকে আরও বলো’—তাহলে সেখানে সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ থাকে।

একই বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর ঝগড়া হতে পারে। কিন্তু অনেক সময় ঝগড়ার আসল কারণ সেই বিষয়টি নয়। কোল একটি দম্পতির উদাহরণ দিয়েছেন, যারা অর্থ খরচ নিয়ে নিয়মিত ঝগড়া করতেন।

দুজনেই দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছিলেন। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাদের ওপর ভিন্ন প্রভাব ফেলেছিল। স্ত্রী চেয়েছিলেন আর্থিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা। তাই তার কাছে সঞ্চয় ও বাজেট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অন্যদিকে, স্বামী নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে ভালো কিছু কিনতে চেয়েছিলেন। দারিদ্র্যের কারণে যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অনুভূতি পেতে চেয়েছিলেন তিনি। ফলে অর্থ খরচের বিষয়টি তাদের নিয়মিত বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

থেরাপিতে তারা নিজেদের শৈশবের অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতা কীভাবে তাদের বর্তমান চাহিদাকে প্রভাবিত করেছে, তা নিয়ে কথা বলেন। এরপর তারা একটি সমঝোতায় পৌঁছান।

কত টাকা সঞ্চয় করবেন এবং কতটা খরচের জন্য রাখা হবে, তা ঠিক করেন দুজন মিলে। অর্থাৎ সমাধানটি শুধু টাকার হিসাব থেকে আসেনি। এসেছে একে অন্যের কাছে টাকাটির মানে কী, সেটি বোঝার মধ্য দিয়ে।

লেবোর মতে, থেরাপি কতটা সফল হবে, তার পেছনে দম্পতির নিজেদের আগ্রহ ও চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একজন দক্ষ থেরাপিস্ট থাকলেই হবে না। সম্পর্ক ঠিক করার জন্য দুজনেরই আগ্রহ থাকতে হবে। দুজন যদি নিজেদের আচরণ, কথা বলা এবং শোনার পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন, তাহলে সম্পর্কের উন্নতির সম্ভাবনা থাকে। এমনকি সম্পর্ক ভালো থাকলেও এসব দক্ষতা আরও উন্নত করা যায়।

সব সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, এমন নয়। তবে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলেও দম্পতি থেরাপি সহায়ক হতে পারে। এতে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক কম বৈরী হতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাবও সামলানো সহজ হতে পারে।

সন্তান থাকলে তাদের মানসিক সুস্থতার দিকটিও এতে গুরুত্ব পায়। লেবোর ভাষ্য, বিচ্ছেদ অত্যন্ত কষ্টের অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে জীবনের এমন কঠিন সময় থেকেই অনেকে নিজের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিখতে পারেন।

সূত্র : বিবিসি
ad728
ad600