দেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম বাড়ায় আবারও আমদানির অনুমতি দেওয়ার দাবি উঠেছে। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি বলছে, সীমিত পরিসরে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে সরবরাহ বাড়তে পারে। এতে দামের ওপরও চাপ কমতে পারে।
তবে এই দাবি নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময় গরুর মাংস আমদানির কথা উঠেছে। এমনকি দুই বছর আগে কম দামে বাংলাদেশে গরুর মাংস দিতে চেয়েছিল ব্রাজিল। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রয়োজনীয় সনদ না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত এগোয়নি বলে জানিয়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত।
বর্তমানে দেশে গরুর মাংসের কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। রেস্তোরাঁ মালিকদের দাবি, কম দামের মাংসে হাড় ও চর্বির পরিমাণ বেশি। ফলে মানসম্মত মাংস সংগ্রহে তাদের খরচ আরও বাড়ছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনের ফার্স হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গরুর মাংস আমদানির দাবি জানান রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংকটে থাকা রেস্তোরাঁ খাতের সমস্যা তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
ইমরান হাসান বলেছেন, রেস্তোরাঁর খাবারের অন্যতম প্রধান উপকরণ গরুর মাংস। কিন্তু এর দাম বেশি হওয়ায় রেস্তোরাঁগুলোকে বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
তার ভাষ্য, খাবারের দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেক রেস্তোরাঁ বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবারের দাম সমন্বয় করতে পারছে না।
বাজারে এখন বিভিন্ন দামে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। সর্বনিম্ন দাম প্রায় ৮০০ টাকা কেজি। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিবের ভাষ্য, ৮০০ টাকা কেজি দরের মাংসে হাড় ও চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে। এতে প্রকৃত মাংসের পরিমাণ কমে যায়। ফলে রেস্তোরাঁগুলোর ব্যয় আরও বাড়ে।
গরুর মাংসের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে গবাদিপশু পালনের ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন ইমরান হাসান।
তিনি বলেছেন, আগে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক কৃষক কয়েকটি করে গরু পালন করতেন। কিন্তু গোখাদ্যের দাম ও গবাদিপশু পালনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখন তা অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এতে গরুর মাংসের সরবরাহেও সংকট তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে সীমিত পরিসরে গরুর মাংস আমদানির অনুমতি চায় রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। সংগঠনটির দাবি, নির্দিষ্ট নীতিমালা ও কঠোর তদারকির আওতায় আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে সরবরাহ বাড়তে পারে। এতে দামের ওপরও চাপ কমতে পারে।
ইমরান হাসান উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক কম দামে গরুর মাংস সংগ্রহ করা গেলে রেস্তোরাঁগুলোও কম দামে গ্রাহকদের খাবার পরিবেশন করতে পারবে।
তার মতে, পাঁচ তারকা হোটেল ও কিছু বিশেষায়িত রেস্তোরাঁ বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানি করে। তাই রেস্তোরাঁ খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নির্দিষ্ট শর্তে আমদানির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
দেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম বাড়লেই আমদানির দাবি ওঠে। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির পাশাপাশি বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতিও অতীতে এ দাবি জানিয়েছে।
তবে আমদানির বিরোধিতা রয়েছে খামারিদের। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএফএ) আগে জানিয়েছিল, দেশে গরুর সংকট নেই।
সরকারি তথ্য-উপাত্ত থেকেও একই বিষয় জানা যাচ্ছে বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছিল। তাদের মতে, গরুর দামকে কেন্দ্র করে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় সরকার বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারে।
দুই বছর আগে ঢাকায় গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা ছুঁইছুঁই করছিল। তখন কম দামে বাংলাদেশে মাংস রপ্তানির আগ্রহ দেখিয়েছিল ব্রাজিল।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি গরুর মাংসের জন্য ব্রাজিলের প্রস্তাবিত দাম ছিল ৪ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫০০ টাকা।
তবে সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ঢাকায় ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস।
তিনি জানিয়েছিলেন, ব্রাজিল অনেক কম দামে বাংলাদেশে গরুর মাংস রপ্তানির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রয়োজনীয় সনদ না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল মাংস রপ্তানি করতে পারেনি।
২০১২ সালের পর ভারত বাংলাদেশে গরু রপ্তানির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে। পরে একপর্যায়ে ভারত থেকে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
এর প্রায় এক দশক পর ২০২২ সালের এপ্রিলে জারি হওয়া আমদানি নীতি আদেশে গরু, ছাগল ও মুরগির মাংসসহ মানুষের খাওয়ার উপযোগী অন্য পশুর মাংস আমদানির ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতির বিধান যুক্ত হয়।
এরপর থেকে বিশেষ কারণ ছাড়া মাংস আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় না বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
এদিকে দেশে গরুর মাংসের দাম বাড়তে থাকায় বিভিন্ন সময় আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি উঠেছে। তবে এখন পর্যন্ত সে পথ খোলেনি। তবে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নতুন দাবির পর গরুর মাংস আমদানির পথ খুলবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।























