ফুটবল বিশ্বকাপের চলমান রোমাঞ্চে একের পর এক ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর মহাকাব্য লিখে আগেই সেমিফাইনালে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। অধীর আগ্রহে ইংলিশরা যখন তাদের প্রতিপক্ষের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই নাটকীয় লড়াই শেষে শেষ চারে পা রাখলো পরম আরাধ্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা।
ইতিহাস, উত্তেজনা আর চিরবৈরিতার সব রঙ নিয়ে প্রস্তুত ফুটবল বিশ্বের সেই স্বপ্নের মহারণ। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দীর্ঘ ৬০ বছরের ট্রফি খরা কাটানোর ঠিক এক ধাপ দূরত্বে পৌঁছানোর এই সুবর্ণ সুযোগ এখন থমাস টুখেলের শিষ্যদের সামনে।
নরওয়েকে অতিরিক্ত সময়ের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নেওয়ার ঠিক পরদিনই ইংলিশরা জানতে পারে, ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের লড়তে হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে।
গত তিনটি আসরের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড। এর আগে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার কাছে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তায় হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের।
আর ফুটবলের এই সর্বোচ্চ আসরে ইংলিশদের একমাত্র ফাইনাল খেলার ও ট্রফি জয়ের স্মৃতি সেই ১৯৬৬ সালের। এটি তারা নিজেদের মাটিতেই উঁচিয়ে ধরেছিল।
টুখেলের অধীনে এবারের ইংল্যান্ড দলটি যেন তারকা দ্যুতি আর ইস্পাতকঠিন মানসিকতার এক দারুণ সংমিশ্রণ। নকআউট পর্বের টানা দুটি ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে, তা দলের মূল শক্তি হয়ে উঠেছে।
শিষ্যদের এই লড়াকু মানসিকতাকেই দলের মূল শক্তি হিসেবে দেখছেন কোচ। টুখেল বলেন, ‘তারা কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়ে না এবং হারতে রাজি নয়। সব বাধা পেরিয়ে মাঠে তারা নিজেদের উজাড় করে দেয়। আর এ নিয়ে তাদের মনে কোনো ক্ষোভ বা আফসোস নেই।’
তবে জয়ের আনন্দ উদযাপনের মাঝেও দলকে সতর্ক করতে ভুলেননি টুখেল। তিনি মনে করেন, ইংলিশদের এখনো খেলার উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে।
কোচের কথায়, সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত জেতার রাস্তা তৈরি করতে পারাটাই আসল কেরামতি। আমরা সেই রাস্তা খুঁজে নিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছি, এটাই সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়। তবে আমার এখনো বিশ্বাস, আমরা এর চেয়েও ঢের ভালো ফুটবল খেলতে পারি এবং সামনে আমাদের তা খেলতেই হবে।
ইংল্যান্ডের এই স্বপ্নযাত্রার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে অধিনায়ক হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যামের জুগপৎ রসায়ন। চলতি টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের করা মোট ১৩টি গোলের মধ্যে ৬টি করে গোল করেছেন তারা দুজন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে একই দলের দুই সতীর্থের এমন অনন্য কীর্তি গড়ার নজির এটাই প্রথম। বিশেষ করে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা বেলিংহ্যাম তো আছেন বিধ্বংসী ফর্মে, শেষ দুই ম্যাচেই করেছেন ৪টি গোল।
বেলিংহ্যামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ কোচ টুখেল বলেন, বড় বড় ম্যাচে একজন বিশ্বমানের তারকার কাছ থেকে ঠিক বিশ্বমানের পারফরম্যান্সই এসেছে। এটা সত্যিই উঁচুদরের খেলা।
এদিকে ইংলিশ ফরোয়ার্ড ননি মাদুয়েকে অবশ্য মজা করে বললেন, বেলিংহ্যামের জন্য এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্স এখন ডালভাত হয়ে গেছে। তার ভাষায়, ও মাঠে যা করছে তা এককথায় অবিশ্বাস্য, যদিও ওর কাছে এগুলো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
নরওয়ের বিপক্ষে জিততে ইংলিশ স্কোয়াডকে নিজেদের শেষবিন্দু দিয়ে লড়তে হয়েছিল। মাঠের তীব্র গরমে খেলোয়াড়রা যখন হাঁসফাঁস করছিলেন, তখন অনেকেই আক্রান্ত হন পেশির টান ও অসুস্থতায়।
কোচ টুখেল জানান, মিডফিল্ডার ডেক্লান রাইস অসুস্থতার কারণে ম্যাচের আগের তিন দিনের বেশির ভাগ সময় বিছানাতেই কাটান। আর সে কারণেই নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের দ্বিতীয় অর্ধে তিনি আর মাঠে নামতে পারেননি।
তবে ফরোয়ার্ড মাদুয়েকের কাছে দিনশেষে জয়টাই শেষ কথা। তিনি সোজাসুজি বলেন, শুনুন, আমরা যদি এভাবেই খেলে পরের দুটি ম্যাচ জিতে যাই, তবে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছি না।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এই লড়াইয়ের ঝাঁজ কতটা তীব্র, তা সহজেই টের পাওয়া যায়। বিশ্বকাপের মঞ্চে এর আগে দুদল মোট পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে।
১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল ইংল্যান্ড। এরপর আসে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ, যা ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বহুচর্চিত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং একক নৈপুণ্যে গড়া শতাব্দীর সেরা গোলের সৌজন্যে আর্জেন্টিনার অবিস্মরণীয় জয়ের সাক্ষী হয়ে আছে।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে মাইকেল ওয়েনের সেই দর্শনীয় গোল এবং ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ডের নাটকীয়তার পর টাইব্রেকারে শেষ ষোলোর লড়াইটি জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। তবে চার বছর পরই মধুর প্রতিশোধ নেন বেকহ্যাম। ২০০২ সালের জাপান বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে ১-০ ব্যবধানের জয় এনে দেন এই ইংলিশ তারকা।
অবশ্য বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক স্মৃতি বেশ সুখকর। ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে ওলি ওয়াটকিন্সের শেষ মুহূর্তের গোলে নেদারল্যান্ডসকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল তারা।
এবার তাদের সামনে লিওনেল স্কালোনির বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারানোর সেই কঠিনতম পরীক্ষা, যার ওপর নির্ভর করছে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট।
টুখেল স্বীকার করেছেন, ক্লাব ফুটবলের তুলনায় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের এই মানসিক ও আবেগের চাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে এই চ্যালেঞ্জটাই তাকে সবচেয়ে বেশি টানে।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তগুলোতে নিজেকে খুব জীবন্ত মনে হয়। আমি এখানেই থাকতে চাই। বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে থাকার ইচ্ছা আমার নেই।
সূত্র : রয়টার্স