ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে কাটিয়েও যখন মনের মতো ফল পাচ্ছিলেন না, তখন ৪৩ বছর বয়সী এমিলি ফেরেরা প্রথাগত ব্যায়াম ছেড়ে বেছে নিলেন এক বিশেষ ইলেকট্রোড স্যুট।
গুগলে এই প্রযুক্তির পেছনের বিজ্ঞান পড়ে এবং নিজের পুরোনো ট্রেইনারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে তিনি এটি পরখ করে দেখার সিদ্ধান্ত নেন।
থাইরয়েড ও পিএমওএসের মতো শারীরিক জটিলতা থাকায় শুরুতে কিছুটা সংশয় থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তিনি আটলান্টার একটি ইএমএস স্টুডিওতে জিম শুরু করেন।
আজ দুই বছর ধরে সপ্তাহে তিন দিন মাত্র ২০ মিনিটের এই ওয়ার্কআউট এবং সাথে দুই দিন কার্ডিও করে নিজের শরীরে এক অভাবনীয় পরিবর্তন দেখছেন এমিলি।
বডি কম্পোজিশন টেস্ট করে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, তার শরীরের চর্বির পরিমাণ কমে পেশির ভর অনেকটাই বেড়েছে।
ব্যস্ত জীবনে পরিবার ও সন্তানকে রেখে জিম বা ফিটনেস ক্লাসে দীর্ঘ সময় ব্যয় করার চেয়ে মাত্র ২০ মিনিটের এই কার্যকর প্রক্রিয়াটিই এখন তার সবচেয়ে পছন্দের।
এমিলির মতো বিশ্বজুড়ে এখন অনেকেই ঝুঁকছেন এই নতুন ধারার শরীরচর্চার দিকে, যার নাম ইলেকট্রিক মাসল স্টিমুলেশন বা ইএমএস।
জিম ও স্পা মেম্বারশিপ অ্যাপ ক্লাসপাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের প্ল্যাটফর্মে ইলেকট্রিক মাসল স্টিমুলেশন ওয়ার্কআউটের চাহিদা ১৬ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
শুধু সাধারণ মানুষই নন, ফুটবল তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তার পেটের পেশি শক্তিশালী করতে এবং অভিনেতা টম হল্যান্ড স্পাইডার-ম্যান চলচ্চিত্রের প্রস্তুতির জন্য এই প্রযুক্তিকে তাদের দৈনন্দিন ওয়ার্কআউটের অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
এই পদ্ধতিতে একটি বিশেষ স্যুটের ভেতরে থাকা ইলেকট্রোডের মাধ্যমে মেশিনের সাহায্যে শরীরে মৃদু বৈদ্যুতিক তরঙ্গ পাঠানো হয়। এর ফলে মানুষের অনিচ্ছাকৃতভাবেই পেশিগুলো সংকুচিত ও প্রসারিত হতে থাকে।
স্কোয়াট বা হালকা ওজন তোলার মতো সাধারণ কিছু মুভমেন্টের মাধ্যমেই পেশিতে তীব্র উদ্দীপনা তৈরি করা হয় এই প্রযুক্তিতে।
মূলধারার ফিটনেসে আসার অনেক আগে ১৯৭০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যাথলেটদের পেশি শক্তিশালী করতে এবং পরবর্তীতে ফিজিওথেরাপির ক্ষেত্রে পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৭০ বছর বয়সী নিক ডি’অ্যামিকো চার বছর আগে একটি জটিল ডাবল লাং ট্রান্সপ্লান্ট অস্ত্রোপচার থেকে সেরে ওঠেন। এরপর নিজের হারিয়ে যাওয়া ফিটনেস ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি ইএমএসের সাহায্য নেন।
নিক বলেছেন, স্যুটটি পরার পর মনে হয় আপনি সাধারণের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ওজন তুলছেন। মাত্র দুই-আড়াই মাসের মধ্যে আমার ওজন প্রায় ৮ পাউন্ড কমেছে এবং হাত, পা ও বুকের পেশিগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি সুগঠিত হয়েছে।”
এমোরি হেলথকেয়ারের ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট ক্রিস্টাল বাসবি জানান, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইএমএস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বিশেষ করে এসিএল রিকনস্ট্রাকশন সার্জারির পর রোগীদের কোয়াড্রিসেপ পেশিকে সচল করতে এবং মস্তিষ্ককে পুনরায় পেশি সংকোচনের বার্তা শেখাতে এটি দারুণ কার্যকর।
চিকিৎসাক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও সাধারণ ফিটনেসের জন্য এটি কতটা সেরা বিকল্প, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি পিটির ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস বিভাগের পরিচালক ড. গ্রেগ হোল্টজম্যান মনে করেন, সাধারণ মানুষের জন্য এই ওয়ার্কআউট সবসময় অর্থবহ নাও হতে পারে।
তার মতে, সাধারণত এই পদ্ধতিটি হয় খুব দুর্বল অথবা খুব শক্তিশালী অ্যাথলেটদের জন্য কার্যকর, যারা নির্দিষ্ট কোনো পেশির বিশেষ উন্নতি চান। কিন্তু সাধারণ ব্যায়ামের হাতিয়ার হিসেবে এটি হয়তো ততটা সাশ্রয়ী বা আরামদায়ক নয়।
“আমাদের শরীর স্বাভাবিক নিয়মে শক্তি সাশ্রয় করতে প্রথমে ছোট পেশিতন্তু (মাসল ফাইবার) ব্যবহার করে এবং পরে বড়গুলো সক্রিয় করে। কিন্তু ইএমএস এর উল্টোটা করে—এটি শুরুতেই একসাথে অনেকগুলো বড় পেশিতন্তুকে উদ্দীপিত করে,” ব্যাখ্যা করেন হোল্টজম্যান।
এ ছাড়া ২০২২ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিস থেকে জানা যায়, পেশির শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রথাগত বা সাধারণ স্ট্রেন্থ ট্রেনিং এবং ইএমএস ট্রেনিংয়ের মধ্যে সামগ্রিকভাবে কোনো বড় পার্থক্য নেই।
সূত্র : সিএনএন