ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ছে সম্পদের বৈষম্য, ক্ষোভও তৈরি হচ্ছে

জোই ড্যানিয়েল
জোই ড্যানিয়েল, সাবেক সদস্য, অস্ট্রেলীয় প্রতিনিধি পরিষদ
ফেসবুকে শেয়ার
অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ছে সম্পদের বৈষম্য, ক্ষোভও তৈরি হচ্ছে
অস্ট্রেলিয়ায় ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পদের ব্যবধানও বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। আমার কাছে এই ক্ষোভ অযৌক্তিক নয়। ছবি : সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ায় মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। আমি মনে করি, এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়তে থাকা সম্পদের বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, অপরাধ এবং রাজনীতির প্রতি হতাশা—সবকিছু মিলেই মানুষের মধ্যে অসহায়ত্ব তৈরি করছে।

সুপারমার্কেট কিংবা পেট্রল স্টেশনে যাওয়া এরই মধ্যে অনেকের জন্য চাপের বিষয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে বেড়েছে সুদের হার। আবারও সুদ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সামনে বড়দিন। ফলে পরিবারের খরচের চাপ আরও বাড়ছে।

বীমার খরচও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে এল নিনোর আশঙ্কা যোগ হয়েছে। ফলে সাধারণত আনন্দের সময় হিসেবে বিবেচিত গ্রীষ্মের ছুটিও অনেক অস্ট্রেলীয়র কাছে এখন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আমি মনে করি, এই চাপগুলোকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা নিয়েও আমাদের উদ্বেগ আছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের চাকরির জন্য হুমকি তৈরি করছে। এমনকি ভবিষ্যতে মানুষের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এআই দিয়ে তৈরি বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট। এসব কনটেন্ট মানুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলছে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পদের ব্যবধানও বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। আমার কাছে এই ক্ষোভ অযৌক্তিক নয়।

মানুষ প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে। কেউ নিজের বাড়িতেই অনুপ্রবেশকারীর মুখোমুখি হচ্ছে। অথচ পরিবহন থেকে শিশু যত্ন—অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো সচল রাখতে কঠোর পরিশ্রম করা অভিবাসীদেরই অন্যায়ভাবে অনেক সময় দায়ী করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভয় ধরানোর মতো। দেশের ভেতরের রাজনৈতিক পরিবেশও খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। বরং সেটি ধীরে ধীরে ট্রাম্পের রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে বলে আমার মনে হয়।

এমনকি রাজ্য সরকারগুলো রাস্তার গর্তও ঠিক করতে পারছে না। কতজনের গাড়ির টায়ার এসব গর্তে নষ্ট হয়েছে, সেই হিসাব নেই।

আমি মনে করি, এসব চাপের প্রভাব আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। বাড়ছে জুয়ার ক্ষতি। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পারিবারিক সহিংসতা এবং নানা ধরনের অসামাজিক আচরণ।

কিন্তু এসব সমস্যা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় আমরা এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি না।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব সমস্যাই কোনো না কোনোভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আর এই যোগসূত্র না বুঝলে আমরা মানুষের ক্ষোভের কারণও বুঝতে পারব না।

অথচ আমরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, মানুষ এত ক্ষুব্ধ কেন? আমার উত্তর সহজ। কারণ মানুষ মনে করছে, নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছুর ওপরই তার নিয়ন্ত্রণ নেই।

দাম বাড়ছে। কিন্তু সেই দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তার নেই। মূল্যস্ফীতি তার নিয়ন্ত্রণে নেই। জলবায়ু পরিবর্তন তার নিয়ন্ত্রণে নেই। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা তার হাতে নেই। অপরাধ নিয়ন্ত্রণও তার হাতে নেই। এমনকি সরকারের সিদ্ধান্তও তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

এ কারণেই আমি মনে করি, মানুষের ক্ষোভকে শুধু রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার, সরকার আসলে কী করার জন্য? আমার কাছে এর উত্তর হলো মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। নিরাপত্তা দেওয়া। ভালো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিশ্চিত করা। এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে সবাই ভালোভাবে বাঁচতে পারে এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।

দেশের সার্বভৌমত্বও রক্ষা করতে হবে। এমন শক্তির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে, যারা মানুষের মতামতকে অসৎভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

কিন্তু আমরা অনেক সময় নিজেদের সম্পদ এমনভাবে দিয়ে দিচ্ছি, যার বিনিময়ে সেই সম্পদ থেকে তৈরি হওয়া অর্থ আমাদের নিজেদের মানুষের জীবন সহজ করতে ফিরে আসছে না।

অস্ট্রেলিয়ান ট্যাক্সেশন অফিসের সর্বশেষ করপোরেট ট্যাক্স ট্রান্সপারেন্সি প্রতিবেদনের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় ব্যবসা করা কিছু বড় কোম্পানি বিলিয়ন ডলার আয় করেও খুব সামান্য বা কোনো করপোরেট আয়কর দিচ্ছে না। গ্যাস রপ্তানিকারক পেট্রোনাস ও কোগাসের মতো কোম্পানির কথাও এখানে আসে।

স্যান্টোস গত এক দশকে প্রায় ৫০ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার আয় করেছে। অথচ ওই সময়ে কোনো করপোরেট আয়কর দেয়নি। আমার প্রশ্ন হলো, এটা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

আমার দৃষ্টিতে সমস্যা আরও গভীর। বহুজাতিক এবং জীবাশ্ম জ্বালানি, জুয়া ও প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করছে। অথচ তাদের কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে সামান্য কর ও জবাবদিহি আদায় করা হচ্ছে।

অন্যদিকে পরিবারগুলো জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এখানেই আমি মনে করি, সরকারের নীতিতে বড় পরিবর্তন দরকার। আমি এটিকে শুধু রিজার্ভ ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে দেখি না। সুদের হার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। তাদের হাতে ব্যবস্থাও সীমিত।

আসল প্রশ্ন আরও বড়, আমরা কীভাবে নিজেদের মানুষের দেখভাল করছি?

রেডব্রিজের অ্যালেক্স ফেইনও এমন একটি পরিবেশের কথা লিখেছেন, যেখানে একচেটিয়া ও দ্বৈত-নিয়ন্ত্রণকারী কোম্পানিগুলো নিজেদের শর্ত ঠিক করার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে আরও বেশি মানুষ মনে করছে, তাদের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন করাই সম্ভব নয়।

আমি মনে করি, এখানেই মানুষের ‘নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই’—এই অনুভূতিটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আমার উত্তর, শুধু কথা বলে নয়, কাজ করে দেখাতে হবে। সরকারি ব্যয়ের কঠিন প্রশ্নের পাশাপাশি বড় কোম্পানি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যও নতুন করে তৈরি করতে হবে। আমি শুরু করতাম রপ্তানি করা গ্যাসের ওপর উইন্ডফল ট্যাক্স বা অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর দিয়ে।

বড় জীবাশ্ম জ্বালানি, জুয়া ও প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর যথাযথ কর আরোপ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান নিয়মকানুনও কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে।

এই খাতগুলো থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে শিশু যত্ন, উচ্চশিক্ষা, ওষুধ এবং ভাড়ার খরচ কমাতে। কমনওয়েলথ রেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্সের মাধ্যমে ভাড়াটিয়াদের সহায়তাও বাড়ানো যেতে পারে।

আমার বিশ্বাস, এসব পদক্ষেপ জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমাতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপও কমাতে পারে। আর হ্যাঁ, রাস্তার গর্তগুলোও ঠিক করতে হবে।

অস্ট্রেলিয়া অসাধারণ সুন্দর একটি দেশ। আমাদের মানুষের মধ্যে স্থিতিস্থাপকতা আছে। আশাবাদ আছে। কিন্তু আমার কাছে প্রশ্ন হলো, এই দেশের সুযোগ ও সমৃদ্ধি যদি সবাই উপভোগ করতে না পারে, তাহলে সেই সমৃদ্ধির অর্থ কী?

আমরা যদি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করি, যেখানে মানুষ নিজের ঘর, চাকরি, পরিবার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমাগত উদ্বিগ্ন থাকে, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সংখ্যা দিয়ে সেই ব্যর্থতা ঢেকে রাখা যাবে না।

আমি মনে করি, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু আরও একটি নীতি বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়। তাদের প্রয়োজন নিজেদের জীবনের ওপর আবার কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া। সরকারের কাজ সেই নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা।

মতামতটি দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুদিত
ad728
ad600