ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বর, ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবর নির্বাচন, তারপর কী?

জুবায়ের হোসাইন সিয়াম
জুবায়ের হোসাইন সিয়াম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বর, ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবর নির্বাচন, তারপর কী?
তবে দুই দেশের নির্বাচনে নেতানিয়াহু বা ট্রাম্পের পরাজয় কিংবা জয় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে। ছবি : রয়টার্স
বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে মধ্যপ্রাচ্য যখন এক অগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে ঘনিয়ে এসেছে নির্বাচনের আবহ। ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইসরায়েলের দীর্ঘপ্রতীক্ষিত ২৬তম নেসেট (পার্লামেন্ট) নির্বাচন। তার ঠিক এক সপ্তাহ পর, ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মিডটার্ম ও জাতীয় স্তরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন।

ভৌগোলিক দূরত্ব হাজার মাইল হলেও, ব্যালাট বাক্সের দিক থেকে এই দুই দেশের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ একই সুতোয় বাঁধা। তেল আবিব থেকে ওয়াশিংটন—নীতিনির্ধারক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের নজর এখন ব্যালাট বাক্সের ফলের ওপর। কারণ, এই নির্বাচনের ফলের ওপরই নির্ভর করছে ইরানে সম্ভাব্য সামরিক জবাব, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নতুন রূপরেখা এবং বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ মোড়।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়; এটি সরাসরি যুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইরানে সামরিক অভিযানের সময় নির্ধারণ এবং আঞ্চলিক স্থায়িত্বের সঙ্গে। ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচন এবং ৩ নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইরানে সম্ভাব্য সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ আপাতত কিছুটা থমকে আছে বা হিসাব-নিকাশের মধ্যে রাখা হয়েছে। 

উভয় দেশের ব্যালাট বাক্সে নেতিবাচক প্রভাব এড়াতেই নির্বাচন পরবর্তী সময়ের জন্য বড় সামরিক পদক্ষেপগুলো তোলা রাখা হচ্ছে।

তবে দুই দেশের নির্বাচনে নেতানিয়াহু বা ট্রাম্পের পরাজয় কিংবা জয় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে।

গত কয়েক মাস ধরে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার টানটান উত্তেজনার মাঝে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক হামলা কবে হতে পারে?

মিডল ইস্ট মনিটরের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক নোরলিজা বিনতে সালেহের মতে, ৩ নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতো। এটি সরাসরি আঘাত হানতো সাধারণ মার্কিনদের পকেটে, যা ভোটের টেবিলে ক্ষমতাসীনদের জন্য বড় বিপর্যয় ঢেকে আনতো।

অন্যদিকে, ডন সামুদ্রিক ও কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য ট্রেভর ডুপুই ইনস্টিটিউটের কৌশলগত সামরিক বিশ্লেষক ড. জুলিয়ান স্পেন্সার-চার্চিল মনে করেন, নির্বাচনের ঠিক মুখে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ইরানের সম্ভাব্য শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পাল্টা হামলা নেতানিয়াহু জোটকে চরম বিপাকে ফেলতো। ফলে উভয় দেশের রাজনৈতিক সুবিধা ও ব্যালাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সামরিক পরিকল্পনাকে নির্বাচনের পর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঝুলছে সরু সুতোয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা-পরবর্তী যুদ্ধ, গাজা ও লেবানন ফ্রন্ট এবং অতি-অর্থোডক্স (হারেদি) ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ নিয়ে চরম কোন্দলে তিনি ব্যাকফুটে আছেন।

ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় টিকে গেলে ইসরায়েল আরও কট্টর সামরিক কৌশলে হাঁটবে। নির্বাচনের পর দিনগুলোতেই তিনি ইরানের পরমাণু ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন।

আর বিরোধী মধ্যপন্থী জোট বা ইয়ার লাপিডের মতো কোনো নেতা ক্ষমতায় এলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করে সামরিক সংঘাতের বদলে আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমঝোতায় প্রাধান্য দিতে পারেন। এতে দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানোর একটি সাময়িক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে ৩ নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচন প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসনের বৈদেশিক নীতির ওপর এক বিশাল ট্রায়াল। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছেন যে ৩ নভেম্বরের আগে কোনো যুদ্ধ বিস্তার নয়। তবে এই নির্বাচনে ট্রাম্পের দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে বা ডেমোক্র্যাটরা সুবিধাজনক জায়গায় চলে এলে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নেবে।

ট্রাম্প বা তার দল জিতলে নির্বাচনের পরেই বাধা তুলে নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক চড়াও অভিযান শুরু করতে পারে।

বিশ্লেষক নোরলিজা বিনতে সালেহ সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প যদি নির্বাচনে ক্ষমতা বা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারান, তবুও ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেস শপথ নেওয়া পর্যন্ত মধ্যবর্তী দুই মাস তিনিই কমান্ড-ইন-চিফ হিসেবে পূর্ণ ক্ষমতায় থাকবেন। এই সময়টিতে ভোটের কোনো ভয় না থাকায় ট্রাম্প আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন এবং সামরিক হামলা অনুমোদনের ক্ষেত্রে তাঁর ওপর রাজনৈতিক কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না।

নির্বাচন শেষে তারপর কী?

ড. জুলিয়ান স্পেন্সার-চার্চিল এর মতে, ৩ নভেম্বরের পর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ‘ব্রেক’ উঠে যাবে। ফলে ইরান ও ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ অক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বিধ্বংসী পর্বের সূচনা হতে পারে।

নোরলিজা বিনতে সালেহের মতে, নির্বাচনের পর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা হলে ইরান বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ লাইন বা হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়ার চরম সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

আর ইসরায়েলে যদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না এসে আবার ঝুলন্ত সরকার গঠিত হয়, তবে তেল আবিব অন্তর্বর্তীকালীন সংকটে পড়বে, যার সুযোগে আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি হবে।
ad728
ad600