আগামী ১০ বছরে পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রায় ৭৮ হাজার নতুন পদ সৃষ্টি ও জনবল নিয়োগের সুপারিশ করেছে সাংগঠনিক কাঠামো সংস্কার কমিটি। এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে নেওয়া হয়েছে একাধিক কর্মপরিকল্পনা। আর এটি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পুলিশে সরাসরি নিয়োগ হবে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও কনস্টেবল পদে। বন্ধ হবে উপপরিদর্শক (এসআই) ও সার্জেন্ট পদে সরাসরি নিয়োগ। এএসপি পদের অর্ধেক সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি অর্ধেক বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো, পদোন্নতির জটিলতা কমানো এবং বাহিনীতে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এ সংস্কার প্রস্তাবের লক্ষ্য। পাশাপাশি থানার জনবল ও অবকাঠামো পুনর্বিন্যাস, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশি সেবা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত জুনে বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর কর্মকৌশল নির্ধারণে ‘সাংগঠনিক কাঠামো সংস্কার’ কমিটি গঠন করা হয়। হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদকে প্রধান করে গঠিত উপকমিটি চার মাস ধরে একাধিক সভা করে সুপারিশমালা তৈরি করেছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের পলিসি গ্রুপে চূড়ান্ত হওয়ার পর এসব সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
উপকমিটির প্রধান ফারুক আহমেদ বলেছেন, ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা কাঠামো পুলিশের গুণগত পরিবর্তন আনতে পারছে না। তাই সংখ্যাগত পরিবর্তনের পাশাপাশি গুণগত পরিবর্তনের জন্য কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
বর্তমানে পুলিশে সবচেয়ে বেশি নিয়োগ হয় কনস্টেবল পদে। কিন্তু তাদের পদোন্নতির সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে এসআই, সার্জেন্ট ও এএসপি পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ধারায় নানা জটিলতা রয়েছে।
একই ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন পদে কর্মরত সদস্যদের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য থেকেও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি বদলাতে কনস্টেবল ও এএসপি পদে সরাসরি নিয়োগ চালু রেখে মধ্যবর্তী পদগুলোতে পদোন্নতির মাধ্যমে জনবল পূরণের সুপারিশ করেছে কমিটি।
এএসপি পদের ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি ৫০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে যোগ্য পুলিশ সদস্যদের উচ্চপদে যাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং বিভিন্ন বিসিএস ব্যাচের পদোন্নতিজট কমবে বলে মনে করছে কমিটি।
প্রস্তাবে কনস্টেবলের ৫০ শতাংশ পদ নায়েক, নায়েকের ১০০ শতাংশ পদ সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই), এএসআইর ১০০ শতাংশ পদ এসআই এবং এসআইর ২৫ শতাংশ পদ পরিদর্শক পদে পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের কথা বলা হয়েছে।
এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নে পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি), বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১-সহ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি সংশোধনের সুপারিশ রয়েছে।
কমিটির হিসাবে, পুলিশের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্য কনস্টেবল পদে নিয়োগপ্রাপ্ত। এসআই বা সমমর্যাদার পদে রয়েছেন ৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং এএসপি ও অন্যান্য পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের হার ১ দশমিক ১২ শতাংশ। বিপুলসংখ্যক কনস্টেবলের পদোন্নতি, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত না করলে পুলিশ সংস্কার পূর্ণাঙ্গ হবে না বলে মনে করছে কমিটি।
দেশের ৬৩৯টি থানাকে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ ও ‘ই’ এই পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে। শ্রেণিভেদে থানার ন্যূনতম জনবল হবে যথাক্রমে ১৫০, ১২০, ১০০, ৮০ ও ৬০ জন। প্রতিটি থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে এএসপি পদ সৃষ্টি ও পদায়নের প্রস্তাবও রয়েছে।
এ ছাড়া থানার ওসি, পরিদর্শক (তদন্ত) ও পরিদর্শক (অপারেশন)-এর জন্য আলাদা গাড়ি রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। টহলের জন্য প্রতিটি থানায় তিন থেকে পাঁচটি পিকআপ এবং মাঠপর্যায়ের এএসআই, এসআই ও পরিদর্শকদের জন্য মোটরসাইকেল দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
জেলা পুলিশ লাইন্সের জনবলও নতুন করে বিন্যাসের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি থানার জনবল অনুযায়ী বাবুর্চি, সহকারী বাবুর্চি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ সৃষ্টির প্রস্তাব রয়েছে।
সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে। এতে নিয়োগবিধি সংশোধন, থানার শ্রেণিবিন্যাস এবং এএসপি পদে নিয়োগ ও পদায়নের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। এ পর্যায়ে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে থানার যানবাহন বাড়ানো, পদোন্নতির ধাপ পুনর্বিন্যাস এবং বিশেষায়িত ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় রয়েছে। এ পর্যায়ে সম্ভাব্য ব্যয় ৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এতে জেলা পুলিশ লাইন্সের জনবল পুনর্বিন্যাস, তদন্তকেন্দ্র ও ফাঁড়ির জনবল নির্ধারণ এবং বিশেষায়িত ইউনিটের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এ পর্যায়ে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা।
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) তথ্য অনুযায়ী, ৪৫তম বিসিএসে ৮০ জন, ৪৬তম বিসিএসে ৭৯ জন এবং ৪৭তম বিসিএসে ১৫০ জনকে এএসপি পদে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তিন বিসিএস মিলিয়ে সুপারিশপ্রাপ্তের সংখ্যা ৩০৯।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, এএসপি থেকে আইজিপি পর্যন্ত ৩ হাজার ১৬৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ২ হাজার ৬০৩ জন। শূন্য রয়েছে ৫৬৫টি পদ। গেজেটের অপেক্ষায় থাকা ৩০৯ জন এএসপি যোগ দিলে শূন্য পদ থাকবে ২৫৬টি।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেছেন, পুলিশের কাঠামো সংস্কারের সুপারিশগুলো ভালো। বাস্তবায়নের পর পরিবর্তনের মাত্রা বোঝা যাবে।
তার মতে, পুলিশের জনবল বাড়ানো প্রয়োজন। তবে কতটা বাড়ানো সম্ভব, তা সরকারের সামর্থ্য ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকও পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, অতীতেও সংস্কারের আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের পর্যায়ে তা আটকে গেছে।
‘এর অন্যতম কারণ পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে রাখা এবং পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা। পুলিশকে জনবান্ধব ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা গেলে প্রস্তাবিত সংস্কার ইতিবাচক ফল দিতে পারে’, মত দেন অধ্যাপক তৌহিদুল হক।
সূত্র : সমকাল।
















