ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিন ৯ বছরেও শেষ হয়নি দুই লেপার্ডের

শাফিন জামান
শাফিন জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিন ৯ বছরেও শেষ হয়নি দুই লেপার্ডের
বন্দিদশার কারণে সাধারণ দর্শনার্থীরাও তাদের দেখার সুযোগ পান না। ছবি : সংগৃহীত
ছোট একটি ঘর। চারদিকে শক্ত লোহার গ্রিল। সেখানেই কেটে যাচ্ছে দুটি লেপার্ডের জীবনের সিংহভাগ সময়। স্বাভাবিক নিয়মে গাছে ওঠার সুযোগ নেই, নেই ছুটে বেড়ানোর খোলা জায়গা কিংবা শিকার করার প্রাকৃতিক পরিবেশ। বন্দিদশার কারণে সাধারণ দর্শনার্থীরাও তাদের দেখার সুযোগ পান না। নিয়ম অনুযায়ী সেখানে থাকার কথা ছিল মাত্র তিন সপ্তাহ। কিন্তু সেই সাময়িক বন্দিত্ব গড়িয়েছে দীর্ঘ প্রায় ৯ বছরে।

গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গাজীপুর সাফারি পার্কের বন্য প্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টিন শেডে বন্দি রয়েছে দুটি লেপার্ড। ২০১৭ সালে মাত্র দেড় মাস বয়সে উদ্ধারের পর থেকে তারা সেখানেই আটকা পড়ে আছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের জন্য উপযুক্ত কোনো আবাস গড়ে তুলতে পারেনি পার্ক কর্তৃপক্ষ।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর যশোরের চাঁচড়া এলাকায় একটি গাড়িতে অভিযান চালিয়ে দুটি লেপার্ড ও দুটি সিংহশাবক উদ্ধার করে পুলিশ। বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগে সে সময় দুজনকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে চারটি শাবককেই চিকিৎসার জন্য গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।

নিয়ম মেনে রোগের সংক্রমণ রোধে তাদের কোয়ারেন্টিন শেডে রাখা হয়েছিল তিন সপ্তাহের জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে সিংহশাবক দুটিকে মূল পার্কে স্থানান্তর করা হলেও লেপার্ড দুটি থেকে যায় সেই শেডেই। উদ্ধারের সময় একটির ওজন ছিল ২ কেজি এবং অন্যটির ১ কেজি ৬০০ গ্রাম। তখন তাদের দৈর্ঘ্য ছিল যথাক্রমে ২৬ ও ২২ ইঞ্চি। অবহেলার মধ্য দিয়েই দেড় মাসের সেই অবোধ শিশু-লেপার্ড দুটির বয়স এখন প্রায় ৯ বছর।

সরেজমিনে দেখা যায়, লেপার্ড দুটি এখনো কোয়ারেন্টিন শেডের সংকীর্ণ কক্ষে অবস্থান করছে। খাবার দেওয়ার সময় একটি কক্ষে তাদের আটকে রাখা হয়। পরে দরজা খুলে দিলে ছোট দুটি ঘরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে খাবার খায় তারা। শেডের কাছে কোনো মানুষ গেলেই হিংস্র ও ক্ষিপ্ত হয়ে গ্রিলের ওপর আছড়ে পড়ে। ঘরের পরিসর এতই ছোট যে স্বাভাবিক চলাফেরা বা লাফানোরও কোনো উপায় নেই।

৯ বছর ধরে ছোট্ট একটি কক্ষেই ২ লেপার্ড | The Daily Star

দীর্ঘদিন এভাবে আটকে রাখাকে অযৌক্তিক ও অন্যায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী–বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান উল্লেখ করেছেন, নতুন আসা প্রাণীদের মাধ্যমে যেন রোগজীবাণু না ছড়ায়, সে জন্য বড়জোর চার সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। এরপর দ্রুত তাদের উপযোগী আবাসে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। সাফারি পার্কে উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি লেপার্ড দুটিকে অবিলম্বে বড় পরিসরে স্থানান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাফারি পার্ক পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সে সময় তিনি লেপার্ড দুটির জন্য উপযুক্ত আবাসন তৈরির পরামর্শ দেন। এর আগেও একাধিকবার উচ্চপর্যায় থেকে তাগিদ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এদিকে উদ্যানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী মো. জহিরুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, বাঘ ও সিংহ দেখার সুযোগ মিললেও লেপার্ড দেখার সুযোগ তারা পাচ্ছেন না। উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হলে সাধারণ মানুষও প্রাণী দুটি সম্পর্কে জানতে পারত।

অভিযোগের বিষয়ে গাজীপুর সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, উপযুক্ত প্রাঙ্গণ ও নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় প্রাণী দুটিকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। তবে সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি দল স্থানটি পরিদর্শন করে গেছে। খুব দ্রুত এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এই কর্মকর্তা।
ad728
ad600