একসময় বর্ষা এলেই নদীজুড়ে দেখা মিলত রুপালি ইলিশের ঝাঁক। সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই ফিকে। দেশে গত পাঁচ বছরে ইলিশের উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬৫ হাজার টন। শুধু নদীতে মাছের পরিমাণ কমে আসাই নয়, কমেছে ইলিশের ডিম উৎপাদন, রেণু পোনা ও জাটকা বেঁচে থাকার হারও। নদীর নাব্যতা হ্রাস, ডুবোচর বৃদ্ধি, দূষণ, অবৈধ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার এবং নির্বিচারে ইলিশ আহরণ—সব মিলিয়ে দেশের জাতীয় মাছটি এখন পড়েছে নতুন সংকটে।
ইলিশ উৎপাদন সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে সারা দেশে ইলিশের উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। চার বছর পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে ইলিশের উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন।
জেলা পর্যায়েও উৎপাদন কমার চিত্র দেখা গেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে চাঁদপুর জেলায় ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৩৩ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৩০৪ মেট্রিক টনে।
শুধু উৎপাদন নয়, ইলিশের জীবনচক্রের বিভিন্ন ধাপেও নেতিবাচক পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ইলিশের ডিম উৎপাদন, রেণু পোনা এবং জাটকা বেঁচে থাকার হার কমেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইলিশের ডিম উৎপাদন হয়েছিল ৮ লাখ ৫ হাজার ৫১৫ কেজি। ৫০ শতাংশ হ্যাচিং হারে এ ডিম থেকে প্রায় ৪ লাখ ২ হাজার ৭৫৮ কোটি রেণু পোনা জলাশয়ে আসে। এর ১০ শতাংশ বেঁচে থাকার হিসাবে জাটকার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ইলিশের ডিম উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫৬৪ কেজিতে। এ বছর রেণু পোনার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৭৮২ কোটি। এর ১০ শতাংশ বেঁচে থাকার হিসাবে জাটকা উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৯ হাজার ৫৭৮ কোটি।
ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন মৎস্য সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, জলবায়ু ও নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট নানা কারণ ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রকে সংকুচিত করছে।
চাঁদপুরের বড়স্টেশন মাছঘাট মৎস্য সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত বলেন, বর্তমান আবহাওয়া ইলিশের জন্য আগের মতো অনুকূল নয়। আগের মতো শীত নেই, কালবৈশাখী ঝড়ও নেই। একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা কমে গেছে, বেড়েছে ডুবোচর এবং দূষিত হচ্ছে পানি। চট্টগ্রামের টং জাল ও সাগরের ট্রলি জালসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের কারণেও ইলিশ উৎপাদন কমেছে। এসব কারণ মিলিয়েই গত চার-পাঁচ বছরে ইলিশের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ইলিশের বাজারেও। ক্রেতা বাবু বলেন, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণেই এর দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এখন চার কেজি গরুর মাংসের দামেও একটি ভালো আকারের ইলিশ কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ইলিশ এখন সোনার হরিণের মতো; অনেকের জন্য এটি বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম বলেন, ইলিশ গভীর জলের মাছ। কিন্তু বর্তমানে নদীতে সেই গভীরতা নেই। নদীদূষণ নিয়েও গবেষণা বাড়াতে হবে। ইলিশের অতিরিক্ত আহরণ ঠেকাতে প্রজনন মৌসুম ও অভয়াশ্রমকালে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে কারেন্ট জাল, রিং জাল ও অন্যান্য বিধ্বংসী জালের উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। গবেষকেরা সমন্বিত উদ্যোগে জলাশয়ে ইলিশ সম্পদ বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করছেন।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ বলেন, গত দুই বছরে ইলিশের উৎপাদন বেশি কমেছে। এর কারণ হিসেবে নদীদূষণ, নির্বিচারে ইলিশ আহরণ, ডুবোচর বৃদ্ধি, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং নদীর উজানে বাঁধ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো সামনে আসছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ও মা ইলিশ ও জাটকা নিধন এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এতে ইলিশের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে আবারও ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।


.jpg)





















