মৃত্যুর পর মানুষ কেন আমাদের স্মরণ করবে—এই প্রশ্ন অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর। কিন্তু গবেষণা বলছে, নিজের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার বা ‘লেগেসি’ নিয়ে ভাবা জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এটি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু বার্ধক্যে নয়, তরুণ বয়স থেকেই এ নিয়ে সচেতন হওয়া উপকারী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর বোলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক বেথ হান্টারের বাবা আলঝেইমারসে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি বাবার সঙ্গে একটি কথোপকথন রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা রাজি হননি।
নিজের অসুস্থতা বা মৃত্যু নিয়ে কথা বলার বদলে তিনি যুদ্ধের স্মৃতিগুলো লিখে রেখে যেতে চেয়েছিলেন। সেটাকেই তিনি নিজের সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার মনে করতেন।
গবেষকদের মতে, প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো উত্তরাধিকার রেখে যান। সচেতনভাবে হোক বা অচেতনভাবে। উত্তরাধিকার শুধু অর্থ-সম্পদ বা শিল্পকর্ম নয়। এটি সাধারণত তিনভাবে প্রকাশ পায়—জৈবিক উত্তরাধিকার, বস্তুগত উত্তরাধিকার এবং মূল্যবোধের উত্তরাধিকার।
জৈবিক উত্তরাধিকার বলতে শুধু সন্তানদের মধ্যে জিনগত বৈশিষ্ট্য ছড়িয়ে দেওয়া বোঝায় না। মৃত্যুর পর অঙ্গদান বা পুরো দেহ চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য দান করাও এর অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ অঙ্গদাতা হিসেবে নিবন্ধিত। তবে প্রতি এক হাজার মৃত্যুর মধ্যে মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে সফলভাবে অঙ্গদান সম্ভব হয়। ২০২১ সালে দেশটিতে ২৬ হাজারের বেশি মানুষ পুরো দেহ গবেষণার জন্য দান করেন।
বেলজিয়ামে শতাধিক দেহদাতার ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ মানুষ বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে অবদান রাখার উদ্দেশ্যে দেহদান করতে চান। অন্যদের মধ্যে অনেকেই মানবকল্যাণ, চিকিৎসাসেবার প্রতি কৃতজ্ঞতা কিংবা নিজের মৃত্যুকে অর্থবহ করে তুলতে এমন সিদ্ধান্ত নেন।
গবেষকদের মতে, মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া মানুষ নিজের জীবনে একটি ইতিবাচক ছাপ রেখে যেতে চান।
জীবনের শেষ সময়ে অনেক হাসপাতাল ও হসপিসে রোগীদের জন্য ‘লেগেসি অ্যাক্টিভিটি’ পরিচালিত হয়। এর মধ্যে থাকে ডায়েরি লেখা, স্ক্র্যাপবুক তৈরি, প্রিয়জনকে চিঠি লেখা, শিল্পকর্ম তৈরি কিংবা ‘এথিক্যাল উইল’ লেখা। এতে মানুষ নিজের মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কার্যক্রম মৃত্যুপথযাত্রী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের উদ্বেগ ও বিষণ্নতা কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে জীবনের শেষ সময় এবং শোকের প্রক্রিয়াও কিছুটা সহজ হয়।
৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মূল্যবোধভিত্তিক উত্তরাধিকার লিখে রাখার অভিজ্ঞতা তাঁদের অতীতকে গ্রহণ করতে, জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে সহায়তা করেছে। অনেকেই এটিকে প্রিয়জনদের জন্য একটি মূল্যবান উপহার হিসেবে দেখেছেন।
১৯৫০ সালে জার্মান মনোবিশ্লেষক এরিক এরিকসন ‘জেনারেটিভিটি’ ধারণার কথা বলেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে অবদান রাখার ইচ্ছা মানুষের মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পরে বিভিন্ন গবেষণায় এই ধারণার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে অনেক গবেষক মনে করেন, এটি শুধু মধ্যবয়সের নয়; বরং সারাজীবনের একটি প্রক্রিয়া।
ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম্বারলি ওয়েড-বেনজোনির মতে, মৃত্যুভয়ও মানুষকে উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে এই ভাবনা মানুষকে শুধু মৃত্যুভয়েই আটকে রাখে না। বরং জীবনের উদ্দেশ্য ও অর্থ নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
তবে গবেষকদের সতর্কতাও আছে। মৃত্যুর পর মানুষ কেন মনে রাখবে, তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত উত্তরাধিকার ব্যাখ্যা করেন যাঁরা বেঁচে থাকেন, তাঁরাই।
তার পরও গবেষণা বলছে, জীবনের শুরু থেকেই নিজের রেখে যেতে চাওয়া উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে মানুষ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত হন। পরিবেশ রক্ষা, দাতব্য কাজে অংশগ্রহণ, চিকিৎসা গবেষণায় সহায়তা কিংবা সমাজের উপকারে আসে—এমন উদ্যোগেও আগ্রহ বাড়ে।
সূত্র : বিবিসি