ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

৪৬ বছর পর ফিরছে গ্রাম সরকার, প্রধান হবেন ইউপি সদস্য

রেজাউল হক
রেজাউল হক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
৪৬ বছর পর ফিরছে গ্রাম সরকার, প্রধান হবেন ইউপি সদস্য
স্থানীয় সরকার বিভাগের তৈরি খসড়ায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যের গ্রাম সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে চালু হয়েছিল ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’। পরে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৯৮২ সালে ব্যবস্থা‌টি বিলুপ্ত হয়। এরপর একাধিকবার গ্রাম সরকার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি।

এবার ১৭ বছর পর আবারও গ্রাম সরকার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে ৪৬ বছর পর ফিরবে এই ব্যবস্থা।

স্থানীয় সরকার বিভাগের তৈরি খসড়ায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যের গ্রাম সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর প্রধান হবেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য। সবকিছু ঠিক থাকলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর এ ব্যবস্থা চালু হতে পারে।

তবে ইউনিয়ন পরিষদ ও ওয়ার্ড সভার পাশাপাশি নতুন এ কাঠামো কতটা প্রয়োজন, মানুষের অংশগ্রহণ কতটা বাড়াবে এবং দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে কি না– তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া। এ বিষয়ে জনগণের মতামত চাওয়া হয়েছে। ফলে গ্রাম সরকার গঠন, সদস্য নির্বাচন ও কার্যক্রমের বিধান এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার এ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় গ্রাম সরকার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন না।

তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা সাধারণত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জন্য গড়ে তোলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেখানে দলীয় নেতাকর্মীদের স্থান দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ব্যবস্থা‌টি চালু হলে ভালো ফলের চেয়ে খারাপ ফল হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

খসড়া অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রাম সরকারে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য থাকবেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হবেন গ্রাম সরকারের প্রধান। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য তার নির্বাচনি এলাকার গ্রাম সরকারগুলোর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে প্রথম সভা থেকে পাঁচ বছর।

সদস্যদের মধ্যে থাকবেন দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন পুরুষ ও একজন নারী সদস্যও থাকবেন। 

এ ছাড়া দুজন কৃষক এবং একজন করে নিকাহ রেজিস্ট্রার, সমবায় সমিতির সদস্য, পল্লিচিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শ্রমিক ও যুব প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ থাকলে তাদের একজন প্রতিনিধিকে সদস্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো শ্রেণির প্রতিনিধি পাওয়া না গেলে গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবকের সংখ্যা বাড়িয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা হবে।

খসড়ায় ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় থাকা অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

খসড়ায় পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ বলতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটিকে বোঝানো হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে গ্রাম সরকারের কাজের পরিধি বেশ বিস্তৃত রাখা হয়েছে। গ্রামের রাস্তাঘাট ও কালভার্ট উন্নয়নে অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয় পর্যালোচনা করবে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারি সেবা কার্যক্রমেও সহযোগিতা করবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্বও দেওয়া হচ্ছে গ্রাম সরকারকে। পাশাপাশি স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন কার্যক্রমেও ভূমিকা রাখবে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ছাড়া কৃষি উপকরণের সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। সংকট দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবে। সমবায়, কুটিরশিল্প, মৎস্যচাষ, পশুপালন, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে মানুষকে উৎসাহিত করার দায়িত্বও থাকবে।

খসড়ায় প্রতি দুই মাসে অন্তত একটি সভা এবং প্রতি ছয় মাসে একটি সাধারণ সভা আয়োজনের প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণ সভায় ওয়ার্ডের অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি থাকতে হবে। কাজের সুবিধায় বিষয়ভিত্তিক কমিটি ও প্রয়োজনে উপকমিটি গঠনের সুযোগও রাখা হয়েছে।

১৯৮০ সালে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার চালুর মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামের মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সংগঠিত করা। ওই বছরের ২৪ মে প্রকাশিত সরকারি গেজেটে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, গণসাক্ষরতা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবার পরিকল্পনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং স্থানীয় বিরোধ মীমাংসাকে এর প্রধান কাজ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। গ্রাম সমবায় ও সমবায় ব্যাংক গড়ে তুলতে উৎসাহ দেওয়ার কথাও ছিল।

১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক সরকারের শাসনামলে এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। পরে ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ‘স্থানীয় সরকার (গ্রাম পরিষদ) আইন, ১৯৯৭’ প্রণয়ন করে। এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৩ সালে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩’ প্রণয়ন করে। তখন ১৯৯৭ সালের আইনটি রহিত করা হয়।

২০০৩ সালের আইনে গ্রাম সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টার পাশাপাশি ১৩ জন সদস্য রাখার বিধান ছিল। সাধারণ সভায় সমঝোতার ভিত্তিতে সদস্য মনোনীত হতেন। মতভেদ হলে পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হতো। অর্থাৎ, প্রধান ও উপদেষ্টা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলেও অন্য সদস্যদের বাছাই করা হতো মনোনয়নের মাধ্যমে।

বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্ট আইনটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের পাশাপাশি মনোনীত সদস্যদের নিয়ে গঠিত এ সংস্থার কাঠামো এবং সংবিধানের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

পরে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রহিতকরণ অধ্যাদেশ জারি করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংসদে রহিতকরণ আইন পাস হয়। তবে আইনটি ২০০৮ সালের ১ জুন থেকে কার্যকর বলে ধরা হয়।
ad728
ad600