ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

১২ কারণে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ, এগিয়ে নারীরা

শাফিন জামান
শাফিন জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
১২ কারণে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ, এগিয়ে নারীরা
বিচ্ছেদের আবেদনে পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতীকী ছবি
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৪৪টি সংসার ভাঙছে। ঘণ্টায় প্রায় দুটি করে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। বিচ্ছেদের আবেদনে পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, সন্দেহ-অবিশ্বাস, মাদকাসক্তি, আর্থিক সংকট, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কসহ অন্তত ১২টি কারণে ভাঙছে দাম্পত্য সম্পর্ক।

ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের বিভিন্ন সময় পর্যন্ত দুই এলাকায় মোট ৪৩ হাজার ২৬৬টি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে আবেদন ২৯ হাজার ২৯৮টি। পুরুষদের পক্ষ থেকে আবেদন ১৩ হাজার ৯৬৮টি। অর্থাৎ পুরুষদের তুলনায় নারীদের পক্ষ থেকে তালাকের সংখ্যা প্রায় ১০৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের শিক্ষা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে নির্যাতন কিংবা অসুখী দাম্পত্য থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বেড়েছে। তবে বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট, পারিবারিক হস্তক্ষেপ, মাদকাসক্তি এবং পারস্পরিক সহনশীলতার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে ৭ হাজার ৫১৪টি তালাক কার্যকর হয়েছে। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৮টি সংসার ভাঙছে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৮৫১টি তালাক কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬টি সংসার ভাঙছে। এই হিসাব অনুযায়ী, উত্তরের তুলনায় দক্ষিণ সিটিতে তালাকের সংখ্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি।

দক্ষিণ সিটির আগের কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও তালাকের প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৩ সালে সেখানে ৭ হাজার ৫৩০টি, ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৬৯৫টি এবং ২০২৫ সালে ৮ হাজার ১৭৪টি তালাক কার্যকর হয়। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে কার্যকর তালাকের সংখ্যা ৭ হাজার ৭১৪টি বলেও প্রতিবেদনের আরেক অংশে উল্লেখ রয়েছে।

উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৪১৪টি তালাকের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে কার্যকর হয় ৫ হাজার ২৩০টি। ২০২৪ সালে ৫ হাজার ৪৫৯টি আবেদনের বিপরীতে তালাক কার্যকর হয় ৫ হাজার ৩০৫টি। ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৮৪৭টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে কার্যকর হয় ৫ হাজার ৩২৬টি।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে উত্তর সিটিতে ৩ হাজার ১৫৯টি তালাকের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে কার্যকর হয়েছে ২ হাজার ৮৫১টি।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তালাকের নোটিশ পাঠানোর পর পুনর্মিলনের ঘটনা খুবই কম। আবেদনের পর মাত্র ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ ক্ষেত্রে আপস হয়েছে।

দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, তালাকের আবেদনে নারীরা পুরুষদের তুলনায় স্পষ্টভাবে এগিয়ে।

দক্ষিণ সিটিতে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ২৩ হাজার ৩৯৯টি তালাক কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে তালাকের সংখ্যা ১৬ হাজার ৮৪৮টি। পুরুষদের পক্ষ থেকে কার্যকর হয়েছে ৬ হাজার ৫৫১টি।

অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১৯ হাজার ৮৬৭টি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে পুরুষদের আবেদন ৭ হাজার ৪১৭টি এবং নারীদের আবেদন ১২ হাজার ৪৫০টি।

দুই সিটির হিসাবে মোট ৪৩ হাজার ২৬৬টি তালাকের মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে ২৯ হাজার ২৯৮টি এবং পুরুষদের পক্ষ থেকে ১৩ হাজার ৯৬৮টি তালাকের আবেদন রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীদের পক্ষ থেকে তালাকের সংখ্যা প্রায় ২ দশমিক ১ গুণ বেশি।

তালাকের নোটিশে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা কারণ ‘মনের অমিল’। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই শব্দের আড়ালে রয়েছে নানা ধরনের দাম্পত্য সংকট।

প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে অন্তত ১২টি কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌতুকের চাপ, ভরণপোষণ না দেওয়া, স্বামী বা স্ত্রীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, মাদকাসক্তি, সন্দেহপ্রবণতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক হস্তক্ষেপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি, একে অন্যকে সময় না দেওয়া এবং যোগাযোগের ঘাটতি। এ ছাড়া পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব ও ‘বিকল্প জীবনের’ আকাঙ্ক্ষাও বিচ্ছেদের পেছনে ভূমিকা রাখছে।

এসব কারণ নারী ও পুরুষ-উভয় পক্ষের দাম্পত্য সম্পর্কেই সংকট তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো মতবিরোধ সময়ের সঙ্গে জটিল হয়ে ওঠে। পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার অভাব সেই সংকট আরও বাড়িয়ে দেয়।

অপরাধ ও মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের শিক্ষার হার ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি তালাকের আবেদনে তাঁদের এগিয়ে থাকার অন্যতম কারণ।

আগে অনেক নারী নির্যাতন, অবহেলা কিংবা অসুখী দাম্পত্যজীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক নির্ভরতার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। এখন নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ার পাশাপাশি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাও বেড়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও অসম্মান মেনে নিয়ে সংসার চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি নিজে তালাকের নেতিবাচক কারণ নয়। কোনো নারী নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলে সেটিকে সামাজিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখতে হবে। অনেক নারী দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপমান এবং অবহেলার শিকার হয়ে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

দাম্পত্য বিচ্ছেদের পেছনে মাদকাসক্তির বিষয়টিও উঠে এসেছে। মাদক সেবনের পর নির্যাতন, পরিবারের প্রতি দায়িত্বহীনতা, অর্থের অপচয় এবং সন্দেহ-অবিশ্বাসের কারণে অনেক সংসারে তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে। তালাকের আবেদনে মাদকাসক্তিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করার ঘটনাও রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহারও দাম্পত্য সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। ফেসবুক, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নতুন সম্পর্ক তৈরি, পুরোনো সম্পর্ক আবার সক্রিয় হওয়া কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ তৈরির ঘটনা বিচ্ছেদের কারণ হয়ে উঠছে।

অনেক ক্ষেত্রে আবেদনে সরাসরি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয় না। বরং ‘মনের অমিল’, ‘মানসিক নির্যাতন’ কিংবা ‘দাম্পত্য কলহ’ হিসেবে কারণ লেখা হয়।

দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, কিছু তালাকের নোটিশে স্বামী বা স্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা দেওয়া হয় না। ফলে নোটিশ পাঠানোর পর তা ফেরত আসে। আবার কেউ কেউ নোটিশ গ্রহণ না করলেও আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাকের নোটিশ পাঠানোর পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনর্মিলনের সুযোগ থাকে। কিন্তু নোটিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে যথাযথভাবে না পৌঁছালে সেই সুযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তালাকের পর সন্তানদের ভবিষ্যৎও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মা-বাবার সম্পর্ক ভেঙে গেলে শিশুদের মানসিক নিরাপত্তা, পড়াশোনা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সন্তানের কথা কিংবা সামাজিক চাপের কারণে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও সমাধান নয়। সম্পর্ক ভাঙনের আগেই দাম্পত্য কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহায়তা এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেছেন, রাজধানীতে উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি হলেও এটিকে সরাসরি বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, দাম্পত্য সম্পর্কে পারস্পরিক সহনশীলতা, ধৈর্য এবং আলোচনা করে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রবণতা কমে যাওয়াই বড় সংকট।
ad728
ad600