ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

দুধে সিসা-আর্সেনিকসহ ১৪ ধরনের বিপজ্জনক ধাতুর উপস্থিতি

ফাইরুজ তাসনিম
ফাইরুজ তাসনিম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
দুধে সিসা-আর্সেনিকসহ ১৪ ধরনের বিপজ্জনক ধাতুর উপস্থিতি
পরীক্ষিত প্রতিটি ধরনের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে সিসার উপস্থিতি নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ছিল।
ঢাকা ও আশপাশের বাজারে বিক্রি হওয়া দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে সিসা, আর্সেনিকসহ ১৪ ধরনের ভারী ধাতু এবং ই-কোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষায় এসব দূষণ শনাক্ত হয়। গবেষণায় পনিরে সিসার মাত্রা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার ৩৯ গুণ পাওয়া গেছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ভারী ধাতু গ্রহণ করলে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

গত আগস্টে ‘ডুয়াল বারডেন অব কেমিক্যাল অ্যান্ড মাইক্রোবায়াল হ্যাজার্ডস ইন ডেইরি প্রডাক্টস ফ্রম ঢাকা, বাংলাদেশ: আ কমপ্রিহেনসিভ ফুড সেফটি অ্যাসেসমেন্ট অ্যাক্রস মার্কেট সিস্টেম’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এতে যুক্ত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজিক্যাল সায়েন্স অনুষদ, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) চট্টগ্রামকেন্দ্র, সেন্টার ফর অ্যানালিটিক্যাল অ্যান্ড রিসার্চ ফ্যাসিলিটিজ (সিএআরই) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্সের (সিএআরএস) গবেষকেরা।

দুধ সরবরাহব্যবস্থায় দূষণের ধরন শনাক্ত করতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত—দুই ধরনের বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। খামার, হকার, স্থানীয় বাজার ও বাণিজ্যিক দোকানসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া হয় মোট ৮৪টি নমুনা।

এর মধ্যে ছিল ৫০টি কাঁচা দুধ, ১২টি ফুটানো দুধ, ১০টি পনির, পাঁচটি বাণিজ্যিক দই, ১০টি রাস্তার মাঠা, পাঁচটি মিষ্টি বা টক দই এবং ঘি ও মাখনের সম্মিলিত শ্রেণির পাঁচটি নমুনা।

উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিক্রি ও ব্যবহারের বিভিন্ন ধাপের তথ্য পেতে নমুনা সংগ্রহের স্থানগুলো নির্বাচন করা হয়। এ ক্ষেত্রে শহর থেকে দূরত্ব, ক্রেতার সংখ্যা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।

গবেষণায় কাঁচা ও পাস্তুরিত দুধ, দই, পনিরসহ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যে ১৪ ধরনের ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। এগুলো হলো সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ, ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, সেলেনিয়াম, লোহা, কোবাল্ট, অ্যালুমিনিয়াম ও ভ্যানাডিয়াম।

পরীক্ষিত প্রতিটি ধরনের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে সিসার উপস্থিতি নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ছিল। গবেষণায় সিসার নিরাপদ সীমা প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য ২ মিলিগ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ পনিরে এর পরিমাণ পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক ৭৮৪ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ নিরাপদ সীমার প্রায় ৩৯ গুণ।

আর্সেনিকের নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম। কিন্তু বীজ দই, কাপ দধি, মাঠা ও পনিরে এর উপস্থিতি নির্ধারিত সীমার অনেক বেশি ছিল। পনিরে আর্সেনিকের পরিমাণ পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে প্রায় ৬২ দশমিক ৮৬ মিলিগ্রাম।

ক্যাডমিয়ামের নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য ১ মিলিগ্রাম। গবেষণায় পনিরে প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য ১৯, কাপ দধিতে শূন্য দশমিক শূন্য ১১ এবং বীজ দইয়ে শূন্য দশমিক শূন্য ১৪ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে।

গবেষণায় পারদের সহনীয় সীমা প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য ১ মিলিগ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে। কাঁচা ও ফুটানো দুধ এবং মাঠায় পারদ পাওয়া যায়নি। তবে পনিরে প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক ১৫৭ মিলিগ্রাম এবং ঘিতে শূন্য দশমিক শূন্য ৪৬ মিলিগ্রাম পারদ শনাক্ত হয়েছে।

নিকেলের অনুমোদিত সীমা প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক ২ মিলিগ্রাম। কিন্তু কাঁচা দুধ থেকে পনির পর্যন্ত সব ধরনের পরীক্ষিত পণ্যে এর মাত্রা নিরাপদ সীমার কয়েক গুণ বেশি ছিল। পনিরে নিকেলের পরিমাণ পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ২ দশমিক ৫৪৫ মিলিগ্রাম।

এ ছাড়া বেশির ভাগ নমুনায় ক্রোমিয়ামের মাত্রা প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক ৩ মিলিগ্রামের নিরাপদ সীমা ছাড়িয়েছে। কিছু নমুনায় তা সীমার কাছাকাছি ছিল। অন্যদিকে, কপার ও জিংকের মাত্রা মোটামুটি নিরাপদ সীমার মধ্যে পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্সের (সিএআরএস) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও গবেষক দলের সদস্য ড. আসমা রহমান বলেছেন, দুধে মাত্রাতিরিক্ত ভারী ধাতু পাওয়া যাচ্ছে। দুধে এসব ধাতু থাকলে তা থেকে তৈরি পণ্যেও সেগুলো থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেছেন, গরুর খাবার, ঘাস জন্মানোর মাটি কিংবা পানির মাধ্যমে দুধে ভারী ধাতু আসতে পারে। তবে দূষণের নির্দিষ্ট উৎস এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

গবেষণায় ঢাকা ও আশপাশের বাজারে বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ডেড ও ব্র্যান্ডবিহীন দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যে ই-কোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব ব্যাকটেরিয়া মানুষ ও পশুপাখির মলমূত্রে থাকতে পারে। এগুলো ডায়রিয়া ও হজমজনিত রোগের কারণ হতে পারে।

গবেষক দলের সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা বলেছেন, দুধে মলবাহিত জীবাণুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক। তাঁর ভাষ্য, সাভার থেকে ঢাকা ও আশপাশের বাজারে দুধ আনার সময় তাতে বুড়িগঙ্গার পানিও মেশানো হয় বলে তাঁরা দেখেছেন। গরুর মলমূত্র থেকেও দুধ দূষিত হতে পারে।

অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা উল্লেখ করেছেন, দুধ খামার থেকেই দূষিত হতে পারে। কাঁচা দুধ দূষিত হলে তা দিয়ে তৈরি পণ্যেও দূষণ থাকার ঝুঁকি থাকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর বলেছেন, দুধে ভারী ধাতু ও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি উদ্বেগজনক। এসব ব্যাকটেরিয়ার কারণে ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।

তিনি জানিয়েছেন, দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে নিলে এসব ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। তবে দীর্ঘদিন ভারী ধাতু গ্রহণ করলে ব্লাড ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার ও উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ad728
ad600