ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

উচ্চশিক্ষিত যুবকদের ১০০ জনে ৩৬ জন বেকার

শাফিন জামান
শাফিন জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
উচ্চশিক্ষিত যুবকদের ১০০ জনে ৩৬ জন বেকার
শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারীদের বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতীকী ছবি
দেশে উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী যুবকের সংখ্যাও। কিন্তু সেই অনুপাতে তৈরি হচ্ছে না কর্মসংস্থান। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও চাকরি পাচ্ছেন না বিপুলসংখ্যক তরুণ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে, দেশে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের প্রতি ১০০ জনের ৩৬ জন বেকার।

সরকারি পরিসংখ্যানেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষার স্তর যত উঁচু, বেকারত্বের হারও তত বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের শেষে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ২০ হাজার। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকার বেড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার।

এমন বাস্তবতায় আজ রবিবার পালিত হচ্ছে জাতীয় যুব দিবস। ‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে নানা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এ উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টজনরা।

শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারীদের বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। এই হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

উচ্চমাধ্যমিক পাস করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। মাধ্যমিক পাস করা ব্যক্তিদের মধ্যে এ হার ২ দশমিক ৯১ শতাংশ।

আর কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই—এমন ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১ দশমিক ২৫ শতাংশ।

আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীর সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের হার ৩৬ শতাংশ।

গবেষণায় ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের যুব জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

এ বয়সি তরুণদের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ১০ শতাংশের কম হলেও উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব অনেক বেশি।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের হারে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। শ্রীলঙ্কায় এই হার ৪৩ শতাংশ এবং ভারতে ৪২ শতাংশ।

আইএমএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত যুবকদের তুলনায় শ্রমবাজারে উপযুক্ত পদের সংখ্যা কম থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার চিত্রও উঠে এসেছে।

বিডিজবস ডটকমে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর প্রোফাইল রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই লাখ চাকরিপ্রার্থী সেখানে পছন্দের চাকরি খুঁজছেন। দুই বছর আগে প্রতিদিন এই সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লাখ।

একটি পদের বিপরীতে বর্তমানে গড়ে ২৮৭ জনের বেশি আবেদন করছেন। কোভিড মহামারির আগের পাঁচ বছরে একটি পদের বিপরীতে গড়ে আবেদন করতেন ১৭৩ জন। অর্থাৎ, একই ধরনের চাকরিতে প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

শুধু কর্মসংস্থানের ঘাটতি নয়, চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।

কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স-২০২৫ অনুযায়ী, চাকরিদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির সক্ষমতায় ৮১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৭তম।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার যুগান্তরকে বলেছেন, দেশে শিক্ষিত যুবকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এর পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা ও দক্ষতার ঘাটতি বড় কারণ।

তার ভাষ্য, প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকায় উচ্চশিক্ষিত হয়েও অনেক তরুণ বেকার থাকছেন।

সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের কৌশলপত্র অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি প্রায় ৫৫ লাখ যুবক শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কোনো প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই।

বিবিএসের ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক এনইইটি হার প্রায় ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক মানুষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছেন।

নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশে যুব নারীদের প্রায় ৬২ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বাইরে।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনও শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে। আইএমএফের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন তৈরি করছে।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমান কর্মীবাহিনীর প্রায় ৪০ শতাংশের দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অর্থনীতির ভাষায় এটি দেশের জনমিতিক লভ্যাংশের বড় সুযোগ।

ইউনেস্কো বলছে, এই বিপুল যুবশক্তিকে সময়োপযোগী দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারলে শিল্প ও সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে। তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান। 

কিন্তু এই তরুণদের জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাই একসময় বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ad728
ad600