দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ চলছে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম শিক্ষক নিয়ে। এসব কলেজে অনুমোদিত পদের প্রায় ৪৭ শতাংশই শূন্য। কোনো কোনো কলেজে শিক্ষকসংকট আরও প্রকট। সেখানে অনুমোদিত পদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত খালি রয়েছে।
এতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাঠদান, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক তত্ত্বাবধানের মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের চলতি মাসের তথ্য অনুযায়ী, ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, কিউরেটর ও প্রভাষক—এই পাঁচ শ্রেণির পদে অনুমোদিত জনবল ৬ হাজার ৫৫৫ জন। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৫০৩ জন। অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ৩ হাজার ৫২টি পদ।
গত বছরের জুলাইয়ে অনুমোদিত ৬ হাজার ৩৮৪টি পদের মধ্যে শূন্য ছিল ২ হাজার ৭২৫টি। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষকসংকট আরও বেড়েছে।
সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রতি শিক্ষাবর্ষে ব্যাচেলর অব মেডিসিন, ব্যাচেলর অব সার্জারি (এমবিবিএস) এবং ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারি (বিডিএস) কোর্সে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন।
পুরোনো কয়েকটি কলেজে ডক্টর অব মেডিসিন (এমডি), মাস্টার অব সার্জারি (এমএস), ফেলোশিপ অব দ্য কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (এফসিপিএস), মাস্টার অব ফিলোসফি (এমফিল) ও ডিপ্লোমা কোর্সও চালু রয়েছে।
প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। এর প্রভাব পড়তে পারে ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতায়।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, মেডিকেল শিক্ষায় সাধারণ নীতিমালা অনুসারে প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক এবং প্রতি ২৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত একজন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষক থাকার কথা।
শিক্ষকসংকট সবচেয়ে বেশি জ্যেষ্ঠ পদগুলোতে। অধ্যাপক পদে অনুমোদিত ৮৮৯টির মধ্যে শূন্য রয়েছে ৫৮৫টি, যা মোট পদের ৬৬ শতাংশ। সহযোগী অধ্যাপকের ১ হাজার ৬৮০টি পদের মধ্যে ৯২৮টি (৫৫ শতাংশ) এবং সহকারী অধ্যাপকের ২ হাজার ৫০৪টি পদের মধ্যে ১ হাজার ৩৫৪টি (৫৪ শতাংশ) শূন্য।
অন্যদিকে প্রভাষকের ১ হাজার ৪২০টি পদের মধ্যে ১৭৯টি (১৩ শতাংশ) এবং কিউরেটরের ৬২টি পদের মধ্যে ৬টি (১০ শতাংশ) খালি রয়েছে।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, নতুন মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষকসংকট বেশি। ২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ২৩টি কলেজে শিক্ষক, জমি, নিজস্ব ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মাগুরা মেডিকেল কলেজে অনুমোদিত ৮৮টি পদের মধ্যে ৫৮টিই শূন্য। শূন্যতার হার প্রায় ৬৬ শতাংশ। কলেজটিতে ১১টি অধ্যাপক পদের ৭টি খালি। ২৩টি সহযোগী অধ্যাপক পদের মধ্যে ১৮টি এবং ২৬টি সহকারী অধ্যাপক পদের মধ্যে ২০টি শূন্য। সরকারি এই কলেজের নিজস্ব একাডেমিক ও হাসপাতাল ভবনও নেই।
কোর্স অসম্পূর্ণ রাখার সুযোগ না থাকায় শিক্ষকদের অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল হাসান জানিয়েছেন, ‘শিক্ষার্থীদের কোনো কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা যায় না। এ কারণে আমাদের অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে। বিষয়টি আমরা প্রতি মাসেই কর্তৃপক্ষকে জানাই। তারা শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নের চেষ্টা করছেন।’
২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ১৮টি অধ্যাপক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪ জন। ৪৬টি সহযোগী অধ্যাপক পদের মধ্যে ৩৩টি এবং ৬৭টি সহকারী অধ্যাপক পদের মধ্যে ৪৯টি শূন্য। কিউরেটরের দুটি পদই খালি।
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ৯৩টি পদের মধ্যে ৫৫টি শূন্য। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ১০৯টি পদের মধ্যে খালি ৬৮টি। আর ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ৮৭টি পদের মধ্যে ৫৪টি শূন্য। হবিগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নেত্রকোনা, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজে কোনো অধ্যাপক কর্মরত নেই।
চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনের ভাষ্য, কিছু বিষয়ে পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক ও ডিগ্রিধারী পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কোথাও পদোন্নতির প্রক্রিয়াও ধীরগতির। ফলে সীমিতসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
শুধু নতুন নয়, পুরোনো ও বড় মেডিকেল কলেজগুলোতেও শিক্ষকসংকট রয়েছে। বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে ৩৪৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ২০৭টি শূন্য। এর মধ্যে অধ্যাপকের ৫৪টি পদের ৪৫টি এবং সহযোগী অধ্যাপকের ৮২টির মধ্যে ৫৯টি খালি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ৪২৫টি পদের মধ্যে ১৬৬টি শূন্য। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ৩৫০টির মধ্যে ১৮৩টি, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে ৩৫৭টির মধ্যে ১৭৮টি, ঢাকা মেডিকেল কলেজে ৪৮৬টির মধ্যে ১৮২টি এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ৩৭৮টির মধ্যে ১৫৫টি পদ খালি রয়েছে।
সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোস্তফা তৌফিক আহমেদ জানিয়েছেন, অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও ফার্মাকোলজির মতো মৌলিক বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকসংকট রয়েছে। এসব বিষয়ে চিকিৎসকদের আগ্রহী করতে নন-প্র্যাকটিসিং ভাতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবু পর্যাপ্ত স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অন্য বিষয়ে পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ নেওয়া চিকিৎসকদের প্রেষণে এনে প্রভাষক পদে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে একাডেমিক কার্যক্রম চালানো গেলেও সংকট কাটছে না। তাঁর মতে, মূল সমস্যা কলেজগুলোর মধ্যে শিক্ষকের অসম বণ্টন।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, অ্যানাটমি, মাইক্রোবায়োলজি, প্যাথলজি, ফিজিওলজিসহ মৌলিক আটটি বিষয়ে ২ হাজার ৬৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১ হাজার ৫৬০ জন।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিক বিবেচনাসহ নানা কারণে যথাযথ প্রস্তুতি ও সক্ষমতা ছাড়া মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকসংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই প্রবণতাকে।
পরিস্থিতির উন্নতি না হলেও এখনো নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চলছে। চলতি বছরের মে মাসে ঠাকুরগাঁও এবং জুনে নরসিংদী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর আগে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, হাসপাতাল ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত, তা বিবেচনার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসাশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, কলেজ ও আসনসংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব বিষয় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির দীর্ঘসূত্রতাও সংকট বাড়িয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের (ডব্লিউএফএমই) সাবেক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেছেন, ‘প্রয়োজন নিরূপণ না করেই সরকার বিভিন্ন স্থানে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে। মান নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ দেখা যায়নি। শিক্ষকসংকট ও একাডেমিক ঘাটতিতে মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে না। কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
গত দুই বছরে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার চিকিৎসকের পদোন্নতি হয়েছে। তবে এসব পদোন্নতির বড় অংশই নিয়মিত শূন্য পদের বিপরীতে দেওয়া হয়নি। বরং অতিরিক্ত (সুপারনিউমারারি) পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
ফলে মেডিকেল কলেজগুলোর নিয়মিত শূন্য পদ পূরণ হয়নি। উদাহরণ হিসেবে, গত বছরের অক্টোবরে গাইনি ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে ৫৯৯ জন চিকিৎসককে সুপারনিউমারারি সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার কথা বলা যায়।
একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর ১২১ জন সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ১১০ জন সুপারনিউমারারি এবং ৪ জন নিয়মিত পদে পদোন্নতি পান।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, কলেজগুলোর শিক্ষকের প্রকৃত চাহিদা অনুমোদিত পদের তিন গুণের বেশি। এর একটি উদাহরণ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ। ১৯৯২ সালে ৫০ আসনে শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন পেলেও বর্তমানে প্রতি শিক্ষাবর্ষে ২০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। অথচ ১৮৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৩ জন।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন জানিয়েছেন, শিক্ষকসংকটের বড় কারণ শিক্ষকদের অসম বণ্টন। পদোন্নতি পাওয়া অনেক শিক্ষক এখনো নতুন পদে দায়িত্ব পাননি। তাঁদের কেউ আগের পদে (ইনসিটু), কেউ বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে, আবার কেউ মেডিকেল কলেজের বাইরে কর্মরত। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কলেজে পদায়ন করা গেলে সংকট অনেকটাই কমবে।

















