ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

এনআইডি সংশোধনের দেড় লাখ আবেদন এখনো কেন ঝুলছে

আরিফ আহমেদ তূর্য
আরিফ আহমেদ তূর্য, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
এনআইডি সংশোধনের দেড় লাখ আবেদন এখনো কেন ঝুলছে
জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন করেও দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে হাজারো নাগরিককে। নানা জটিলতায় নির্বাচন কমিশনে (ইসি) ঝুলে আছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪টি আবেদন। এসব আবেদনের পেছনে রয়েছে ভুল তথ্য, ভুয়া কাগজপত্র, তথ্যের গরমিলসহ নানা ধরনের অসংগতি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবেদনকারীর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

আবার প্রবাসীদের বয়স সংশোধন, একাধিক জন্মনিবন্ধন সনদ, গলা কাটা পাসপোর্ট ও দত্তক গ্রহণসংক্রান্ত জটিলতাও রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব কারণে আবেদন যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে জটিলতায় পড়তে হচ্ছে তাদের। বিশেষ করে বড় ধরনের তথ্য পরিবর্তনের আবেদনে অসংগতি ও জালিয়াতির আশঙ্কা বেশি। তবে বছরের পর বছর আবেদন ঝুলে থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ নাগরিকেরা।

অন্যদিকে, এনআইডি সংশোধনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি প্রতারক চক্র। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে চলছে তাদের কার্যক্রম। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য অবৈধভাবে কেনাবেচার অভিযোগও উঠেছে।

কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৩ নভেম্বর পর্যন্ত কমিশনে ছয়টি ক্যাটাগরিতে মোট ৬৬ লাখ ১২ হাজার ৪৩৩টি সংশোধনের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৮৯টি। এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪টি আবেদন। এসব আবেদনের প্রায় ৯২ শতাংশই চলতি বছরের।

অনিষ্পন্ন আবেদনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৩ হাজার ৩৭২টি ‘ঘ’ ক্যাটাগরির। এ ক্যাটাগরিতে নাম বা ব্যক্তিগত তথ্য পরিবর্তনের আবেদন করা হয়। এসব আবেদনের ক্ষেত্রে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালকের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

নির্বাচন কমিশন এনআইডি সংশোধনের আবেদনগুলোকে ছয়টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে। এগুলো হলো- ক, ক-১, খ, খ-১, গ ও ঘ। ‘ক’ ক্যাটাগরিতে নামের বানানসহ ছোটখাটো ভুল সংশোধন করা হয়। ‘ক-১’ ও ‘খ-১’ ক্যাটাগরিতেও ছোটখাটো বানান বা ভুল সংশোধনের আবেদন থাকে। ‘খ’ ক্যাটাগরিতে ছবি, স্বাক্ষর বা অন্যান্য তথ্য পরিবর্তনের বিষয় রয়েছে। ‘গ’ ক্যাটাগরিতে নাম কিংবা বাবা-মায়ের নামের বড় ধরনের পরিবর্তনের আবেদন করা হয়। আর ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে জন্মতারিখ, বয়স ও বাবা-মায়ের নামসংক্রান্ত তথ্য সংশোধনের আবেদন থাকে।

‘ঘ’ ক্যাটাগরির পর সবচেয়ে বেশি আবেদন ঝুলে আছে ‘খ’ ক্যাটাগরিতে। এ ক্যাটাগরিতে অনিষ্পন্ন আবেদন ২১ হাজার ৩২৮টি। এরপর ‘ক’ ক্যাটাগরিতে ১৯ হাজার ৪৪টি, ‘গ’ ক্যাটাগরিতে ১৬ হাজার ৮১৫টি, ‘খ-১’ ক্যাটাগরিতে ৪ হাজার ৬০৭টি এবং ‘ক-১’ ক্যাটাগরিতে ১ হাজার ৪৭৮টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

এ বিষয়ে এনআইডি শাখার একজন পরিচালক জানিয়েছেন, নানা ধরনের জটিলতার কারণেই সংশোধনের আবেদনগুলো ঝুলে আছে। প্রতিটি আবেদনের পেছনে আলাদা ঘটনা রয়েছে। বয়স সংশোধনের অনেক আবেদনে পারিবারিক ও ওয়ারিশ সনদের তথ্যের সঙ্গে অসংগতি পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ভাই-বোনের জন্মের ব্যবধান দেখানো হয়েছে মাত্র ছয়-সাত মাস। আবার আবেদনকারীর চাওয়া বয়স অনুযায়ী তার ভোটার হওয়ার বয়স দাঁড়ায় সাত বা আট বছর।

ওই কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, অনেক আবেদনকারী এনআইডির তথ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন চান। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশেরই অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করে দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। আবার কেউ কেউ এনআইডিতে নাম পরিবর্তন করে জমি দখল কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এনআইডি সংশোধনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে একটি প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে তারা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এনআইডি জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের জমি দখলের অভিযোগও উঠেছে। এতে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অবৈধভাবে কেনাবেচার অভিযোগও রয়েছে।

গত ১৫ জানুয়ারি জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি এবং নাগরিকদের গোপনীয় তথ্য অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, নাগরিকদের তথ্য কেনাবেচা করে তারা মাসে কোটি টাকার বেশি লেনদেন করতেন।

এদিকে, দেশের ১৮ লাখেরও বেশি নাগরিকের তথ্য ডার্ক ওয়েবে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ সাইবারস্টেশন। সংস্থাটি দেশের ১৫টি খাতের ৭৬৭টি ডোমেইন পর্যালোচনা করে প্রায় সব কটির ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের প্রমাণ পেয়েছে।

ইসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এনআইডি সার্ভারের তথ্য অনৈতিকভাবে সংশোধন ও স্থানান্তরের জন্য একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড ও ওটিপি সরবরাহ করা হতো। এর বিনিময়ে প্রতিদিন মিলত ৫ হাজার টাকা। ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্যরা এসব তথ্য বিভিন্ন কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে সরবরাহ করতেন। এভাবেই চলত এই অবৈধ ব্যবসা।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন নাগরিকদের সেবা দিচ্ছে। কোনো অভিযোগ থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ad728
ad600