ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

অতিরিক্ত সচিব পদে আসছে পদোন্নতি, তালিকায় ৩০০ কর্মকর্তা

শাফিন জামান
শাফিন জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
অতিরিক্ত সচিব পদে আসছে পদোন্নতি, তালিকায় ৩০০ কর্মকর্তা
পদোন্নতির প্রত্যাশায় গত কয়েক দিন ধরে এসএসবির সদস্যদের সঙ্গে দেখা করছেন কর্মকর্তারা। সালাম বিনিময়ের পাশাপাশি নিজেদের পরিচয় তুলে ধরছেন তারা।
প্রশাসনে গতি ও দক্ষতা বাড়াতে অতিরিক্ত সচিব পদে বড় ধরনের পদোন্নতি দিতে যাচ্ছে সরকার। এ পদে পদোন্নতির জন্য তিন শতাধিক যুগ্মসচিবের চাকরির নথি জমা পড়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বাছাই কমিটি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) কাছে। কর্মকর্তাদের অতীত কর্মজীবন, পদায়ন ও সার্বিক তথ্য যাচাই-বাছাই করছে কমিটি। প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রশাসনে গতি আনার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কোনো বিবেচনার চেয়ে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, উপযুক্ত কর্মকর্তারা বঞ্চিত হলে প্রশাসনে প্রত্যাশিত গতি ফিরবে না।

নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরে তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন তিনি। তবে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর গতির সঙ্গে প্রশাসনের সবাই তাল মেলাতে পারছেন না। দক্ষতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ কেউ হিমশিম খাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে পরিচিত অতিরিক্ত সচিব পদে দক্ষ কর্মকর্তাদের যুক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দ্রুতই এ পদোন্নতি দেওয়া হতে পারে। এসএসবি প্রধান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গনি ইতোমধ্যে কয়েকটি সভা করে কর্মকর্তাদের পদোন্নতির তথ্য যাচাই-বাছাই করেছেন। আরও কয়েকটি সভা করার কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। তাঁর অনুমোদনের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জিও জারি করা হবে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী জানিয়েছেন, পদোন্নতির কার্যক্রম এগিয়ে নিতে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কাজও শুরু হয়েছে। এসএসবির মাধ্যমে পদোন্নতির সুপারিশ আসে। তাঁর আশা, মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তারাই পদোন্নতি পাবেন।

জানা গেছে, নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ২১তম বিসিএসকে সামনে রেখে এ পদোন্নতি দিতে যাচ্ছে সরকার। ২০০৩ সালের ৩১ মে এ ব্যাচের কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। তখন প্রশাসন ক্যাডারে দুই শতাধিক কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছিলেন। বর্তমানে ২১তম ব্যাচের প্রায় ১৭০ কর্মকর্তার তথ্য পদোন্নতির জন্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ২০তম ব্যাচসহ অন্যান্য ব্যাচের আরও দেড় শতাধিক কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তার সংখ্যাই বেশি।

সর্বশেষ গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, এ বছরের জানুয়ারিতে নির্বাচনের আগে অতিরিক্ত সচিব পদে ১১৮ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে ২০তম ব্যাচের প্রায় ১৮০ কর্মকর্তা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন। তাঁদের অনেকেই এখনো পদোন্নতির আশায় রয়েছেন।

বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে অনেক কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তবে ২০তম ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা এখনো পদোন্নতির প্রত্যাশায় রয়েছেন। সব মিলিয়ে তিন শতাধিক কর্মকর্তার চাকরির অতীত ও বর্তমান তথ্য যাচাই করছে এসএসবি। কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের সার্বিক তথ্য-উপাত্ত বা ‘ডসিয়ার’ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করছে কমিটি।

‘সরকারের উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং সচিব পদোন্নতি বিধিমালা, ২০০২’ অনুযায়ী, অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য যুগ্মসচিব হিসেবে অন্তত দুই বছরসহ মোট ২২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ২০২২ সালে ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন।

এদিকে, পদোন্নতির প্রত্যাশায় গত কয়েক দিন ধরে এসএসবির সদস্যদের সঙ্গে দেখা করছেন কর্মকর্তারা। সালাম বিনিময়ের পাশাপাশি নিজেদের পরিচয় তুলে ধরছেন তারা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের তৎপরতা বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেকে জনপ্রশাসন উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে দেখা করে দোয়া চাইছেন। কেউ কেউ অতীতে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরছেন।

পদোন্নতির দৌড়ঝাঁপে রয়েছেন বিভিন্ন বিতর্কে জড়ানো কর্মকর্তারাও। যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা বা বিভাগীয় মামলা রয়েছে, তাদের কেউ কেউ পদোন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে যাচ্ছেন। কারও কারও বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলা পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে নাকচ হলেও তারা পদোন্নতির আশায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অতিরিক্ত সচিবের স্থায়ী পদ রয়েছে ৪১৮টি। সর্বশেষ পদোন্নতির পর এ পদে কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৪০০। তাঁদের মধ্যে অনেকে অবসরে যাচ্ছেন। ফলে পদের তুলনায় কর্মকর্তার সংখ্যা কমে আসছে। আগে অতিরিক্ত সচিবের স্থায়ী পদের চেয়ে বেশি কর্মকর্তা থাকলেও বর্তমানে সংখ্যা কম। এ কারণে সচিবালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উইংয়েও শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, যাচাই-বাছাইয়ের নামে যেন রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া না হয়। প্রশাসনে মেধার ঘাটতি তৈরি হলে দেশ সংকটে পড়ে। পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ আচরণ শুরু করতে হবে কোনো না কোনো সরকারকেই।

তিনি উল্লেখ করেছেন, কোনো কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক ছিলেন কি না, কারও ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ছিলেন কি না, এসব বিবেচনায় না নিয়ে তার পেশাদারত্ব ও দক্ষতা যাচাই করা উচিত। পদোন্নতি না পেলে একজন কর্মকর্তার কেমন কষ্ট হয়, তা এসএসবি বোর্ডের অনেক সদস্যেরই জানা থাকার কথা। কোনো ব্যাচমেটের কথা শুনে কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে যেন কোনো প্রার্থী ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

বিনা কারণে কাউকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয় বলে মনে করেন ফিরোজ মিয়া। তার ভাষ্য, সৎ, কর্মদক্ষ, যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তারা যাতে কোনোভাবেই বঞ্চিত না হন, সেই নিশ্চয়তা সরকারকেই দিতে হবে। পদোন্নতিতে ন্যায্যতা নিশ্চিত হলে কর্মকর্তারা কাজের ক্ষেত্রে আরও উৎসাহিত হবেন।
ad728
ad600