আমেরিকাকে যদি কেউ কোনো দিন পরাজিত করতে চায়, তাহলে তার গণতন্ত্রকে আগে ধ্বংস করতে হবে। দুনিয়ার প্রতিটি জাতির কিছু শক্তিশালী ভিত থাকে। ফাউন্ডেশন থাকে। আমেরিকার সেই শক্ত ভিত হলো গণতন্ত্র।
মাত্র দুই বছর আগে, আমেরিকার জনগণ ট্রাম্প ও তার রাজনৈতিক দলকে বিপুল সমর্থনে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। মাত্র দুই বছরের মাথায়, ওরাই তার পারফরম্যান্স ও কর্মকাণ্ডে খুশি না হয়ে, ডেমোক্র্যাটদেরকে সিনেট, হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও গভর্নর—তিনটি সেক্টরেই জয়ী করে দিয়েছে।
সহজ করে বললে, রিপাবলিকানদের হাতে এখন একচেটিয়া ক্ষমতা নেই। ডেমোক্র্যাটদের হাতেও অনেক ক্ষমতা এসেছে। একটা ভারসাম্য কিংবা চেক অ্যান্ড ব্যালান্স তৈরি হয়েছে। এই যে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য—এটা আমেরিকা ছাড়া দুনিয়ার খুব বেশি দেশে সম্ভব নয়।
আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদার যারা ছিলেন, তাদের দূরদর্শিতা আমাকে সবসময়ই বিস্মিত করে। কী অসাধারণভাবে পুরো রাষ্ট্রের মেকানিজম এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তারা করে গিয়েছেন। ২৫০ বছর আগে, তারা ভেবেছিলেন, প্রেসিডেন্ট যেন স্বৈরাচার না হতে পারে, এমন কিছু করতে হবে। এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকেও স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার আইনগত স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন।
ফলে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়ও মধ্যবর্তী নির্বাচনে পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে পারেন না। অনিয়মের অভিযোগ যে থাকে না, তা না। কিন্তু ক্ষমতা দেখিয়ে মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে নেবে, সেই কাজটা সামগ্রিকভাবে করা সহজ নয়।
মিডটার্মে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির মানে এই নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ক্ষমতা একেবারে কমে গেছে। কিংবা মানুষের জীবন দুই মাসেই পরিবর্তন হয়ে যাবে। কিন্তু এই ভরাডুবি হলো একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের মুখে চপেটাঘাত। প্রেসিডেন্টকে বুঝিয়ে দেওয়া যে, ‘জনগণ তোমাকে দেখছে!’
আমাকে অনেকেই বলেছিল, ট্রাম্প সংবিধান পরিবর্তন করে হলেও মেয়াদ শেষে ক্ষমতায় থাকবে। আমি বলেছি, খোদ রিপাবলিকানরাই এই কাজটা ট্রাম্পকে করতে দেবে না। আমেরিকার ২৫০ বছরের ইতিহাসে একজন প্রেসিডেন্টও অনৈতিকভাবে একদিনের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। এই বিষয়টা সবসময়ই আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে।
মানুষের দুনিয়াতে, সব দেশেই কখনো না কখনো, একজন খারাপ এবং ক্ষমতালোভী প্রেসিডেন্ট তো আসতেই পারে। দুনিয়ার বহু দেশেই তো এমন নজির আছে। তাহলে, গত ২৫০ বছরে কি একজন প্রেসিডেন্টও আমেরিকায় আসেননি, যিনি মেয়াদ শেষেও ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন! হয়তো এসেছেন। কিন্তু সে সুযোগ তারা পাবেন না।
আর এই একটা কারণেই, আমেরিকায় বহু সমস্যা থাকার পরও, রাষ্ট্র হিসেবে সে ভেঙে পড়ে না। আমেরিকায় দারিদ্র্যতা আছে। গরিব আছে। নিম্নমধ্যবিত্ত আছে। চুরি আছে। ডাকাতি আছে। সন্ত্রাসী আছে। আমেরিকা বহু যুদ্ধ-বিগ্রহ-গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমেরিকা যে এত বড় একটা রাষ্ট্র নিয়ে, এত বৈচিত্র্যতা নিয়ে, এত লড়াইয়ের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শক্তিশালী হয়ে—তার সবচেয়ে বড় কারণ এই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।
মানুষের হাতে সত্যিকারের একটা ক্ষমতা, যেটা দিয়ে মানুষ তার পছন্দের দল ও প্রার্থীকেও মাত্র দুই বছরে ডুবিয়ে দিতে পারে। চার বছর পরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়, আবার সেখানেই, দুই বছরের মাথায় একটা মধ্যবর্তী নির্বাচন রাখা হয়েছে। যেন কোনো প্রেসিডেন্টকে মানুষ সম্মিলিতভাবে একটা হুমকি দিতে পারে। কত দূরদর্শী ছিলেন আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদাররা।
ট্রাম্প যদি সংবিধান পরিবর্তন করে অনৈতিকভাবে ক্ষমতায় থাকেন, তাহলে সবচেয়ে লাভবান হবে আমেরিকার শত্রু দেশগুলো। তারা অচিরেই দেখতে পাবে, এই দেশটা কী করে ধ্বংস হয়ে যায়। এবং আমেরিকার মানুষ এটা হতে দেবে না।
আমেরিকা এটাও জানে, যে গণতন্ত্র তার দেশে শক্ত ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা অন্য দেশে নাও হতে পারে। এজন্যই বহু দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সে যুদ্ধ করতে পারে। চাপিয়ে দিতে পারে। জোর করতে পারে।
তবে গণতন্ত্র ছাড়াও যে নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব সমাজের দর্শনের সঙ্গে সমাজতন্ত্রকে ব্লেন্ড করে বিশ্বকে চমকে দেওয়া যায়, তার উদাহরণ চীন। আধুনিক কালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা এখানেই দ্বিধান্বিত! আমেরিকা সবসময় সমাজতন্ত্রকে তার দেশের শত্রু মনে করে এসেছে। এখনো করে। আর চীন সবসময় গণতন্ত্রকে তার দেশের জন্য শত্রু মনে করে।
আগামী বিশ্বের এই দুই পরাশক্তি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বহু মিল-অমিল অর্থনৈতিকভাবে উদীয়মান বহু দেশের প্রভাবক হবে।
লেখা ফেসবুক থেকে সংগৃহীত


 (4).jpg)














