ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও কেন থামছে না শ্রমিক আন্দোলন

আরিফ আহমেদ তূর্য
আরিফ আহমেদ তূর্য, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
মজুরি বোর্ড গঠনের পরও কেন থামছে না শ্রমিক আন্দোলন
গত অক্টোবরের শেষের দিকে উত্তরা এলাকায় মজুরি বাড়ানোর দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। ছবি : সংগৃহীত
রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ থামছেই না। মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায়।

আজ মঙ্গলবারও সড়ক অবরোধ, কারখানায় ছুটি ঘোষণা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কোথাও যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

শ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাদের।

অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় নিয়েই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের একটি অংশও আন্দোলনকারীদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবু মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া, দাবির বাস্তবায়ন এবং আন্দোলনের মধ্যে বহিরাগতদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

গত অক্টোবরের শেষের দিকে উত্তরা এলাকায় মজুরি বাড়ানোর দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা এবং সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ৩১ অক্টোবর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শ্রমিকেরা বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করেন। কয়েকটি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

১ নভেম্বর মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১২ এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভের পাশাপাশি গাজীপুরের কালিয়াকৈর এবং আশুলিয়াতেও উত্তেজনা দেখা দেয়। অবরোধের কারণে বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। আশুলিয়ার একটি কারখানার কাছে সড়ক থেকে বোমাসদৃশ তিনটি বস্তু উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

জাতীয় দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ নভেম্বর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় ৫২৯টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল।

আন্দোলনের প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সড়কে আটকে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী ও কর্মজীবী মানুষও। অনেককে দীর্ঘ পথ হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এন্টারপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্টের ‘ম্যাপড ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের হিসাবে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা ছিল ৩ হাজার ৩১৫টি। এ শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে কর্মরত রয়েছেন লাখ লাখ শ্রমিক, যাদের বড় অংশ নারী।

ফলে পোশাকশিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে শ্রমিকদের জীবিকা, দেশের রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ববাজারেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে চীনের পর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। ওই বছর বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে বেতন পুনর্নির্ধারণ করা। তাদের দাবির মুখে গত ১ নভেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। এতে শ্রমিক, মালিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।

বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন।

বোর্ডের কাজ হবে পোশাক শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা। অবশ্য বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ার সময় প্রথম বৈঠক ও নতুন মজুরি ঘোষণার নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো জানানো হয়নি।

পোশাক শ্রমিকরা বলছেন, মজুরি বোর্ড গঠন হলেও তাদের অসন্তোষের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অসংগতি। আছে নতুন মজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তাও।

শ্রমিকদের আশঙ্কা, বোর্ড গঠন হলেও তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণে সময় লাগতে পারে। শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর সিদ্ধান্ত চান তারা।

মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় আন্দোলনরত ৪৫ বছর বয়সী শ্রমিক মোহসিনা জানিয়েছেন, পোশাক খাতে ১৮ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতায় ক্রয়ক্ষমতা এতটা কমে যেতে দেখেননি।

‘সকাল সাড়ে ৭টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে রাত ৮টার পর ফিরেও অতিরিক্ত কাজসহ মাসে তার আয় হয় প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৮ হাজার টাকা চলে যায় বাড়িভাড়ায়। বাকি টাকা দিয়ে খাবার, সন্তানদের শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে’, বলছিলেন মোহসিনা।

আন্দোলনরত আরেক শ্রমিক জানিয়েছেন, মালিকপক্ষ দুপুরের দিকে কাজে ফিরতে বলেছিল। বলা হয়েছিল, মজুরি নিয়ে বিদেশি ক্রেতা, বিজিএমইএ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

কিন্তু লিখিত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়া মৌখিক আশ্বাসে আস্থা রাখতে চাননি তিনি। নতুন মজুরি ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন ওই শ্রমিক।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুনের ভাষ্য, অক্টোবরের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে শ্রমমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় অসন্তোষ বেড়েছে। তার মতে, বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার খবর শ্রমিকদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছায়নি। ফলে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে তারা রাস্তায় নেমেছেন।

মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন শ্রমিক প্রতিনিধি ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা আলোচনার মাধ্যমে নতুন মজুরি নির্ধারণ করবেন।

‘কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন শ্রমিকদের আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে’, অভিযোগ মন্ত্রীর।

তার বক্তব্য, বোর্ড গঠনের বিষয়টি আগে থেকেই শ্রমিক প্রতিনিধি ও মালিকপক্ষকে জানানো হয়েছিল। এরপরও কিছু কারখানায় ছুটি ঘোষণা এবং আন্দোলন অব্যাহত থাকার পেছনে পরিকল্পিত উসকানি থাকতে পারে।

পরিস্থিতি নিয়ে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

পরদিন ২ নভেম্বর পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বৈঠক শেষে তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কিছু শিল্পোদ্যোক্তা ও সাবেক জনপ্রতিনিধি আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছেন।

তার দাবি, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ভিডিও, অডিওসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবিদাওয়া আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মজুরি বোর্ড গঠনের পর আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার ও সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার।

বাবুল আখতার বলেছেন, শ্রমিকদের দাবি ও বক্তব্য মজুরি বোর্ডে গুরুত্ব পাবে। নতুন বোর্ড কাজ শুরু করেছে। তাই ধৈর্য ধরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে শ্রমিকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া উচিত। তার প্রত্যাশা, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

এদিকে, শ্রমিকদের আন্দোলনে বহিরাগতদের উসকানি রয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। শিল্প পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসিম উদ্দিন বলেছেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সহিংসতা অব্যাহত থাকায় তৃতীয় পক্ষের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ সর্বোচ্চ ধৈর্য ধরেছে এবং কারখানা রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ২ নভেম্বর আশুলিয়া ও সাভারের পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে বলেছেন, কিছু ব্যক্তি শ্রমিকদের দাবির বাইরে অন্য উদ্দেশ্যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ, সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিও এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আন্দোলনের মধ্যে ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কারখানার মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ad728
ad600