যুদ্ধের আশঙ্কা মাথায় রেখে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ব্রিটেনের হাতে সময় আছে এক হাজার দিনের কিছু বেশি। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং সতর্ক করে বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে রাশিয়ার সামরিক শক্তি ও যুদ্ধকালীন অর্থনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যাতে দেশটি ব্রিটেন ও তার ন্যাটো মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করে। তাই সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলা এবং মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রস্তুতি নিতে চায় ব্রিটেন।
ব্রিটেনের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয়, সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি এবং গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাঞ্চলীয় সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রতিরক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, পর্যাপ্ত সেনাসদস্য ও আধুনিক অস্ত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কতটা প্রস্তুত, তা নিয়েও বিতর্ক চলছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে লেখা এক নিবন্ধে ওয়েস স্ট্রিটিং জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষ দেশগুলো যে ব্রিটেনের ক্ষতি করতে চায়, তা দেশটির কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। পরিবর্তন এসেছে তাদের সেই ক্ষতি করার সক্ষমতায়।
স্ট্রিটিংয়ের ভাষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে রাশিয়ার সামরিক শক্তি ও যুদ্ধকালীন অর্থনীতি দেশটিকে হামলা চালানোর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। সে কারণেই ব্রিটেনের হাতে এক হাজার দিনের কিছু বেশি সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়া এবং প্রয়োজনে জয়ী হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
তবে ব্রিটেনের এই প্রস্তুতির অর্থ যুদ্ধ অনিবার্য, এমন নয়। বরং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর যুক্তি, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে হামলা থেকে বিরত রাখতেই সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যর্থ হলে যেন ব্রিটেন যুদ্ধ মোকাবিলা করতে পারে, সেই প্রস্তুতিও রাখতে হবে।
রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে মস্কো ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ইউক্রেনকে সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে ব্রিটেন। এ কারণে রুশ কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে ব্রিটেনকে সতর্কও করেছেন।
ব্রিটেনের সামরিক প্রস্তুতির প্রশ্নে এখন বড় বিতর্ক প্রতিরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে। আগামী বুধবারের (২৮ অক্টোবর) বাজেটকে সামনে রেখে এ আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলির পদত্যাগের পর বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়। হিলির অভিযোগ ছিল, ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক হুমকির মুখে ব্রিটেনকে সুরক্ষিত রাখতে যে অর্থ প্রয়োজন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও তৎকালীন সরকার তা দিতে রাজি হয়নি।
পদত্যাগপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি না দেওয়ার বিষয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা গেছে। পরে স্টারমারের উত্তরসূরি অ্যান্ডি বার্নহামের অধীনে হিলিকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে যে ব্যয়সংক্রান্ত বিরোধ তার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল, এখন সেই বিতর্কের কেন্দ্রেই রয়েছেন তিনি।
স্ট্রিটিংয়ের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সরকার এখনো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার আগের প্রতিশ্রুতি দিতে আগ্রহী নয়। বরং ২০৩৫ সালের মধ্যে ন্যাটোর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যে পৌঁছানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে সরকারের কাছে।
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলেও বার্নহাম পদক্ষেপ নিতে দেরি করছেন।
গেল সেপ্টেম্বরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের শত্রুরা লেবার পার্টি তাদের বিরুদ্ধে লড়ার অর্থ জোগাড় করা পর্যন্ত বসে থাকবে না।’ তার দল কল্যাণ খাতসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা দিয়েছে।
তবে স্ট্রিটিংয়ের মতে, শুধু ব্যয়ের শতাংশ বা নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে বিতর্কে আটকে থাকলে চলবে না। আসল লক্ষ্য হতে হবে, প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যর্থ হলে ব্রিটেন যেন কার্যকরভাবে যুদ্ধ মোকাবিলা করতে পারে।
ব্রিটেনের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রসীমা। উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তা, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে যোগাযোগপথ এবং জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো রক্ষায় এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটি ওই অঞ্চলে দেশটির সামরিক সক্ষমতায় ‘গুরুতর ঘাটতি’ থাকার কথা জানিয়েছে। কমিটির আশঙ্কা, এসব দুর্বলতার কারণে ব্রিটিশ জনগণ, দেশটির পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন রুশ হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
২০৩০ সালের মধ্যে ওই অঞ্চলে ব্রিটেনের সামরিক ও নৌ উপস্থিতি জোরদারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনার আহ্বান জানিয়েছে কমিটি। তাদের উদ্বেগ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হলে এর প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
এতে সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যদিকে, সামরিক কর্মকর্তারা যেসব দুর্বলতার কথা ইতিমধ্যে তুলে ধরেছেন, সেগুলোও দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে।
ব্রিটেনের প্রস্তুতি শুধু সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে নিজেদের সুরক্ষায় প্রস্তুত থাকার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের নতুন প্রস্তুতিমূলক প্রচারে পরিবারগুলোকে অন্তত তিন দিনের প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি মজুত রাখতে বলা হয়েছে। জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ বা অন্যান্য পরিষেবা ব্যাহত হলে যাতে মানুষ প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন, সেটিই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
তবে এই প্রচারকে আসন্ন যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারের বক্তব্য, সম্ভাব্য সংঘাতসহ বিভিন্ন ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোই এর লক্ষ্য।
কারণ, সামরিক বাহিনী প্রস্তুত থাকলেও বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ, সরবরাহব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা অচল হয়ে পড়লে সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রস্তুতিও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
ব্রিটেনের সামনে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ। আধুনিক অস্ত্র, পর্যাপ্ত সেনাসদস্য, যুদ্ধজাহাজ এবং অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় সমুদ্রসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তাও জোরদার করতে হবে।
স্ট্রিটিংয়ের সতর্কবার্তার মূল কথা হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে রাশিয়া ন্যাটোর জন্য সরাসরি সামরিক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে ব্রিটেন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা সফল হবে, তা শুধু সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যের ওপর নির্ভর করবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তব সামরিক সক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায়, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।
ব্রিটেনের লক্ষ্য যুদ্ধ শুরু করা নয়, সম্ভাব্য হামলা ঠেকানো। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়। হাতে থাকা এক হাজার দিনের কিছু বেশি সময়ে এসব ঘাটতি কতটা পূরণ করা সম্ভব হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বড় একটি অংশ।
সূত্র : লন্ডন লাভ বিজনেস
















