যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। এতে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রভাব অনেকটাই কমে আসবে।
তবে নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকা বিস্তৃত ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ এখনো রয়েছে তার। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও মেয়াদের বাকি সময়ে ট্রাম্প কতটা প্রভাবশালী থাকবেন, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কয়েকটি আসন দখল করে নিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। এর মধ্য দিয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে দলটি।
নির্বাচনের ফল নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ায় অবশ্য দুই ধরনের সুর দেখা গেছে। একদিকে তিনি ফল মেনে নেওয়া এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ জানিয়েছেন। অন্যদিকে, রাজনৈতিকভাবে তাদের মোকাবিলার প্রস্তুতিও দেখিয়েছেন।
গত মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে পরাজয়ের দায় নিজের ওপর নিতে চাননি ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, নির্বাচনে নিজে প্রার্থী ছিলেন না বলেই রিপাবলিকানরা হেরেছে। তার দাবি, তিনি প্রার্থী হলে দলটি ‘ব্যাপক ব্যবধানে’ জয়ী হতো।
নির্বাচনের ফল দেখার সময় হোয়াইট হাউসে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি নির্বাচনের ফল ‘নিঃসন্দেহে মেনে নিতে’ এবং ‘ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে’ প্রস্তুত।
তবে এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পরিচিত লাল রঙের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ টুপির একটি ছবি প্রকাশ করেন তিনি। টুপিতে প্রচলিত স্লোগানের পরিবর্তে লেখা ছিল ‘ভেটো’। কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো আইন আটকে দেওয়ার প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতার দিকেই ছিল এই বার্তা।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর সমালোচক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে ট্রাম্পকে ইতিমধ্যে ‘লেম ডাক’ বা প্রভাব হারাতে থাকা প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তাদের মতে, মেয়াদের বাকি দুই বছরে তার রাজনৈতিক প্রভাব আরও কমে যেতে পারে।
‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্ট বলতে কী বোঝায়
সাধারণত কোনো প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ পর্যায়কে ‘লেম ডাক’ সময় বলা হয়। বিশেষ করে উত্তরসূরি নির্বাচিত হওয়ার পর বর্তমান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার আগ পর্যন্ত সময়কে এ নামে অভিহিত করা হয়। এ সময়ে মেয়াদের বাকি সময় সীমিত থাকায় বিদায়ী প্রেসিডেন্টের প্রভাব ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায় বলে মনে করা হয়।
তবে কোনো রাজনীতিকের ক্ষমতা ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসার কারণে নীতিনির্ধারণে তার প্রভাব কমে যাওয়ার দীর্ঘ সময়কেও ‘লেম ডাক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রিপাবলিকান পার্টি ও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকায় এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের এজেন্ডায় ট্রাম্পের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। এখন কংগ্রেসের দুই কক্ষের নেতৃত্ব ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেই প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের ক্ষমতা ছাড়ার নির্ধারিত সময় ২০২৯ সালের জানুয়ারি। অর্থাৎ তার বর্তমান মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র দুই বছর বাকি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়কে ট্রাম্পের নীতির প্রতি ভোটারদের অনাস্থা হিসেবেও দেখছেন অনেকে। ফলে নিজ দলের আইনপ্রণেতাদের তাঁর নীতির পক্ষে ধরে রাখার সক্ষমতাও কমতে পারে।
এসব কারণে মেয়াদের আরও দুই বছর বাকি থাকতেই ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের ‘লেম ডাক’ পর্যায়ে প্রবেশ করছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
তবে ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্টকে সাধারণত দুর্বল বা অকার্যকর হিসেবে দেখা হলেও ইতিহাসে এর ভিন্ন উদাহরণ রয়েছে। মেয়াদের শেষ পর্যায়েও প্রেসিডেন্টরা নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থাৎ কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই তাঁদের ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।
ট্রাম্পের হাতে এখনো কী কী ক্ষমতা রয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রে এখন বিভক্ত সরকারব্যবস্থা কার্যকর হতে যাচ্ছে। কংগ্রেসে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রভাব কমলেও নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে ট্রাম্পের হাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকছে।
অতীতে কংগ্রেসে আইন পাসের ক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরি হলে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। এর ফলে আইনসভার নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই হোয়াইট হাউসের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস ট্রাম্পের চাহিদার তুলনায় অনেক কম অর্থ বরাদ্দ দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন তিনি। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য অন্য খাত থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন।
কোনো প্রেসিডেন্ট জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে কংগ্রেস যৌথ প্রস্তাবের মাধ্যমে তা বাতিল করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট সেই প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারেন।
প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটদের একার পক্ষে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব নয়। ফলে কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে ট্রাম্পের হাতে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহারের বড় সুযোগ থাকবে।
মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের আনা সব ‘উন্মাদনাপূর্ণ’ বিলে তিনি ভেটো দেবেন। তাঁর ভাষায়, কয়েক মাস ভেটো দেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা বাইরে এসে জানতে চাইবে, কীভাবে এসব কাজ এগিয়ে নেওয়া যায়। তখন তাঁরা একসঙ্গে কাজ করবেন।
অতীতের ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্টরা কি সফল হয়েছেন
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মেয়াদের শেষ পর্যায়ে থেকেও বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এ সময়ে তারা সাধারণত এমন বিষয়গুলোতে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন, যেগুলোতে নির্বাহী বিভাগের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিস্তৃত ক্ষমতা রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) সেন্টার অন ইউএস পলিটিকসের গবেষক জেমস বয়েজ আলজাজিরাকে বলেছেন, রিপাবলিকান পার্টির জন্য নির্বাচনের ফল ক্ষতিকর হলেও অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রেসিডেন্টকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। তাই ট্রাম্পের ক্ষমতার বাকি সময়ের বড় একটি অংশ এ খাতেই ব্যয় হবে বলে ধারণা করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেও এর নজির রয়েছে। ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্ত করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামে পরিচিত এই চুক্তির পাশাপাশি কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও নেন তিনি।
নিজের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে ওবামা তার বিতর্কিত স্বাস্থ্যসেবা আইন ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ (এসিএ) বহাল রাখতেও সক্ষম হন।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও ক্ষমতার শেষ কয়েক মাস পররাষ্ট্রনীতিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। ২০০০ সালে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলনের আয়োজন করেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনা সফল হয়নি।
এ ছাড়া নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে ৫ কোটি ৮৫ লাখ একর বনভূমি সংরক্ষণ, নির্ধারিত ফেডারেল এলাকায় বড় পরিসরে খনন ও গাছ কাটা সীমিত করা এবং পানির উৎস সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন ক্লিনটন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দেওয়ার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও ‘লেম ডাক’ পর্যায়ে প্রবেশ করেন। ক্ষমতার শেষ দিনগুলোতে তিনি ছেলে হান্টার বাইডেনকে ব্যাপক পরিসরে ক্ষমা করেন। পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ থেকে সুরক্ষা দিতে আগাম ক্ষমা ঘোষণা করেন।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আগের নীতিতে পরিবর্তন এনে ইউক্রেনকে রাশিয়ার আরও গভীরে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেন বাইডেন। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় এসে ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ বাতিল করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে ৬১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজের অবশিষ্ট অর্থ দ্রুত ছাড় করতে প্রতিরক্ষা দপ্তরকে নির্দেশও দেন তিনি।
এসব উদাহরণ দেখায়, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুযোগ থেকে যায়। ফলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব কমে আসার আশঙ্কা থাকলেও মেয়াদের বাকি দুই বছরে তিনি কতটা সক্রিয় থাকবেন, তা নির্ভর করবে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের কৌশল এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ওপর।
সূত্র : আলজাজিরা।

















