ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ad728

দুই বিমানবন্দরে ১০ বছর পড়ে আছে ১৩ পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ

রেজাউল হক
রেজাউল হক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
ফেসবুকে শেয়ার
দুই বিমানবন্দরে ১০ বছর পড়ে আছে ১৩ পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর শাহজালালে পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজ ২০২৪ সালে বাজেয়াপ্ত করা হয়।
দেশের দুই বিমানবন্দরে বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে ১৩টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ। মূল্যবান জায়গা দখল করে থাকা এসব উড়োজাহাজ এখন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জন্য বড় প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো অ্যাপ্রোনে পড়ে আছে ১২টি উড়োজাহাজ। আর কক্সবাজার বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকায় খোলা আকাশের নিচে রয়েছে আরও একটি। এসব উড়োজাহাজের কারণে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বেবিচকের বকেয়া পাওনা ছাড়িয়েছে এক হাজার কোটি টাকা।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর শাহজালালে পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজ ২০২৪ সালে বাজেয়াপ্ত করা হয়। এবার সেগুলো স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বেবিচক। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো অ্যাপ্রোনে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা দখল করে আছে ইউনাইটেড, রিজেন্ট, জিএমজি ও অ্যাঞ্জেল এয়ারলাইন্সের ১২টি উড়োজাহাজ।

এসব উড়োজাহাজের কারণে মূল্যবান অ্যাপ্রোন এলাকা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এতে কার্গো ফ্লাইটের পার্কিং সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে কার্গো হ্যান্ডলিং ও বিমানবন্দরের স্বাভাবিক পরিচালন কার্যক্রম।

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, অকেজো উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে সেখানে ১২টি নতুন পার্কিং বে চালু করা গেলে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় সম্ভব।

শাহজালালে চারটি এয়ারলাইন্সের কাছে বেবিচকের বকেয়া পাওনা রয়েছে প্রায় ৯০২ কোটি টাকা।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও একাধিক নোটিশের পর ২০২৪ সালের ২৬ মে শাহজালালে পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্ত করে বেবিচক। তবে এরপরও সেগুলো সরানো সম্ভব হয়নি।

সচল উড়োজাহাজ হিসেবে উপযুক্ত ক্রেতা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এগুলো স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি হিসেবে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দেশে উপযুক্ত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান না থাকায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ভিত্তিমূল্য নির্ধারণেও জটিলতা তৈরি হয়।

পরে বেবিচকের ৩২০তম বোর্ড সভায় উন্মুক্ত দরপ্রস্তাবের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ দরদাতা ‘অ্যারোফরিয়া এয়ারস্পেস’-এর প্রস্তাব অনুযায়ী ভ্যাট ও আইটি ছাড়া ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।

গত ১৯ অক্টোবর বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোহা. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক স্বাক্ষরিত চিঠিতে উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রির জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন চেয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়।

বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানিয়েছেন, অনুমোদন পাওয়া গেলে দরপত্র আহ্বান করা হবে।

শাহজালালে পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের রয়েছে আটটি। রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি। জিএমজি ও অ্যাঞ্জেল এয়ারলাইন্সের রয়েছে একটি করে।

বেবিচকের চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বারবার চিঠি দিয়েও উড়োজাহাজগুলো সরানো সম্ভব হয়নি। এতে রপ্তানি কার্গো এলাকায় নিয়মিত ও অনিয়মিত কার্গো ফ্লাইটের পার্কিং সংকট তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব পড়ছে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও দেশের রপ্তানি কার্যক্রমেও। মূল্যবান অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারায় সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেছেন, বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বছরের পর বছর পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ পড়ে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তার ভাষ্য, এসব উড়োজাহাজ শুধু মূল্যবান জায়গা দখল করে রাখছে না, বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোন ও কার্গো এলাকায় এ ধরনের উড়োজাহাজ পড়ে থাকা পরিচালন সক্ষমতার জন্য বড় বাধা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রতিটি উড়োজাহাজের মালিকানা ও আইনি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে সেগুলো অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন এই এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ। একই সঙ্গে এত দিনেও উড়োজাহাজগুলো অপসারণ না হওয়ার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকায় ১২ বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের একটি এটিআর ৭২-২১২ মডেলের অকেজো উড়োজাহাজ।

২০১৪ সালের ২০ জুলাই ৪৩ জন যাত্রী নিয়ে অবতরণের সময় উড়োজাহাজটির নোজ গিয়ার ভেঙে যায়। তদন্ত শেষে ২০১৬ সালে এটি এয়ারলাইন্সের কাছে হস্তান্তর করা হলেও পরে আর সরিয়ে নেওয়া হয়নি।

বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে উড়োজাহাজটিতে মরিচা ধরেছে। এতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. গোলাম মোর্তোজা হোসেন গত ২ নভেম্বর বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে উড়োজাহাজটি দ্রুত অপসারণের জন্য দাপ্তরিক আবেদন জানিয়েছেন।

২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এই একটি উড়োজাহাজের বিপরীতে বেবিচকের বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৪৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
ad728
ad600