মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় শরীরে পুষ্টির বাড়তি চাহিদা। এর সঙ্গে রয়েছে অপুষ্টি ও সুষম খাবারের অভাব। সব মিলিয়ে পুরুষের তুলনায় নারীদের রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। বিশেষ করে কৈশোর থেকেই পুষ্টিহীনতায় ভোগা অনেক নারী বিয়ে ও মাতৃত্বের পর আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।
স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ জন নারীর মধ্যে প্রায় আটজনই রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ১০ জনে প্রায় চারজন।
চট্টগ্রাম বিভাগের চারটি গ্রামীণ ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা মানুষের ওপর গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস গত ১০ অক্টোবর গবেষণাটি প্রকাশ করে।
এতে দেখা যায়, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৪৫৯ জনের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশের রক্তস্বল্পতা দেখা গেছে। নারী ও পুরুষের তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে আক্রান্তের হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ শতাংশের মৃদু, ২৯ দশমিক ৬ শতাংশের মাঝারি এবং ২ দশমিক ৬ শতাংশের তীব্র রক্তস্বল্পতা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় তিনজনের একজন মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।
গবেষণার উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় নারীদের মৃদু রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার আপেক্ষিক ঝুঁকি ২ দশমিক ৫১ গুণ। মাঝারি রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ১১ দশমিক ৫৩ গুণ। তীব্র রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রেও নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা কম হওয়ায় এই হিসাবের অনিশ্চয়তা তুলনামূলক বেশি।
শুধু নারী-পুরুষের মধ্যে নয়, শারীরিক ওজনের সঙ্গেও রক্তস্বল্পতার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক ওজনের মানুষের তুলনায় কম ওজনের মানুষের মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩ দশমিক ৪২ গুণ বেশি।
গবেষণার সময় চারটি গ্রামীণ ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা মোট ২ হাজার ১১৮ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে যাঁদের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার তথ্য পাওয়া গেছে, এমন ৪৫৯ জনকে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে নারী ২৩৫ জন এবং পুরুষ ২২৪ জন।
গবেষকদের পরামর্শ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ ও চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়ার সময় নারী-পুরুষের ঝুঁকির এই ব্যবধানকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আফসানা হাবিব শিউলীর মতে, বাংলাদেশে অনেক মেয়ে কৈশোর থেকেই অপুষ্টিতে ভোগে। পরবর্তী সময়ে বিয়ে ও মাতৃত্বের কারণে তাদের শরীরে পুষ্টির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ায় রক্তস্বল্পতার ঝুঁকিও বাড়ে।
রক্তস্বল্পতার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে নারীদের রক্তস্বল্পতার প্রধান কারণ পুষ্টিহীনতা, কম বয়সে বিয়ে ও মাতৃত্ব। এর মধ্যে বিয়ে ও গর্ভধারণের কারণে শরীরে পুষ্টির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ খাবার না পাওয়ায় তাদের রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়ে।’
দেশে রক্তস্বল্পতার সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় ২০২০ সালের জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভেতে। ওই জরিপে রক্তস্বল্পতার হার ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে জরিপটি এখনো সরকারিভাবে অনুমোদিত নয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ে তথ্যসূত্র হিসেবে এর ব্যবহার সীমিত বলে জানিয়েছেন ডা. আফসানা হাবিব শিউলী।
রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে পুষ্টিকর খাবার সম্পর্কে সচেতনতার অভাবকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তার ভাষ্য, ‘পরিবারগুলোকে বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও বাস্তবে খাদ্যাভ্যাসে এর প্রতিফলন কম।’
কোন খাবার থেকে কী ধরনের পুষ্টি পাওয়া যায়, সে সম্পর্কেও অনেকের পর্যাপ্ত ধারণা নেই। এ অবস্থায় পুষ্টি বিষয়ে সার্বিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে অভ্যস্ত করতে সামাজিক ও আচরণ পরিবর্তন যোগাযোগ (এসবিসিসি) কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন।
রক্তস্বল্পতার অন্যতম পরিচিত কারণ আয়রনের ঘাটতি। তবে সব ক্ষেত্রে এর কারণ এক নয়। ফলেট ও ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, সংক্রমণ এবং বংশগত কিছু রক্তরোগ থেকেও রক্তস্বল্পতা হতে পারে। পুষ্টিকর খাবারের অভাবের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমিত সুযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
গবেষণাটিতে রক্তস্বল্পতার সব কারণ আলাদাভাবে নির্ণয় করা হয়নি। এ ছাড়া নির্দিষ্ট চারটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা মানুষের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণার ফলাফল তৈরি হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। তাই এই ফলাফলকে জাতীয় চিত্র হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, রক্তস্বল্পতার কারণ নির্ণয় না করে শুধু আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া ঠিক নয়। কারণ সব ধরনের রক্তস্বল্পতা আয়রনের অভাবে হয় না। তাই হিমোগ্লোবিন ও ফেরিটিনের মাত্রা পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।
গবেষণার সহগবেষক ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম মনে করেন, শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা দিয়ে রক্তস্বল্পতা কমানো সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
তার পরামর্শ, গ্রামীণ নারীদের নিয়মিত রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কিশোরী, সন্তান ধারণের বয়সী নারী ও গর্ভবতীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। যাঁদের রক্তস্বল্পতা শনাক্ত হবে, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে হবে।
আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তবে শুধু ওষুধ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না বলে মনে করেন এই গবেষক। তাঁর ভাষ্য, ‘শুধু ওষুধ বিতরণ করলেই হবে না। নারীরা নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন কিনা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসায় উন্নতি ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণে আনতে হবে।’
পরিবারের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার ওপরও জোর দিয়েছেন মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, শাকসবজি ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি-যুক্ত ফল খেলে শরীরে আয়রন শোষণ ভালো হয়। পাশাপাশি খাবারের সঙ্গে চা পান না করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।’
কিশোরীদের পুষ্টি ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়েও বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন এই গবেষক। তাঁর মতে, ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নিরাপদ মাতৃত্ব এবং সন্তান জন্মদানের মধ্যে যথেষ্ট বিরতি নিশ্চিত করতে হবে। এতে নারীদের শরীর সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।’
পাশাপাশি গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকর্মী ও মোবাইল স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। মাঝারি ও তীব্র রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত নারীদের দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো জরুরি। নারীর পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে।
এ বিষয়ে মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের বক্তব্য, ‘পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বুঝতে হবে, নারীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্য শুধু তাঁর নিজের দায়িত্ব নয়, পুরো পরিবারেরই দায়িত্ব।’
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সালাহউদ্দিন শাহ জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্তের হার বেশি। তাই রক্তস্বল্পতার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
গবেষণায় নারীদের মধ্যে মাঝারি ও তীব্র রক্তস্বল্পতার হার বেশি হওয়ার বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তার ভাষ্য, মাঝারি ও তীব্র রক্তস্বল্পতায় আক্রান্তদের অবহেলা করার সুযোগ নেই। নারী ও পুরুষের মধ্যে রক্তস্বল্পতার এই ব্যবধানের প্রকৃত কারণ জানতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর আরও গবেষণা প্রয়োজন।
















